ট্র্যাকিং ও রোমাঞ্চকর ভ্রমনের স্বাদ পেতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন সিলেটের “হামহাম জলপ্রপাতে” | Bahumat

ট্র্যাকিং ও রোমাঞ্চকর ভ্রমনের স্বাদ পেতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন সিলেটের “হামহাম জলপ্রপাতে”

1513188_238707922967560_788535058_n

হামহাম জলপ্রপাত
সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি রিজার্ভ ফরেস্টের কুরমা বনবিটের গহিন অরণ্যঘেরা দুর্গম পাহাড়ী এলাকার রযেছে অপূর্ব এই জলপ্রপাত। এডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটক যারা চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করেন কেবল তাদের জন্যই এই ঝর্না দর্শন। সরকারী কোন উদ্যোগ না থাকায় উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই সেখানে।
কেবলমাত্র দৃষ্টিনন্দন ঝর্না নয় পথের দুপাশের বুনো গাছের সজ্জা দৃষ্টি কেড়ে নেবে অনায়েসে। জারুল, চিকরাশি ও কদম গাছের ফাঁকে ফাঁকে রঙিন ডানা মেলে দেয় হাজারো প্রজাপতি। চশমা বানরের আনাগোনা ডুমুর গাছের শাখায় । চারদিকে গাছগাছালি ও প্রাকৃতিক বাঁশবনে ভরপুর এ বনাঞ্চল। ডলু, মুলি, মিটিংগা, কালি ইত্যাদি অদ্ভুত নামের বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ এ বাগানগুলোকে দিয়েছে ভিন্ন একরূপ। পাথুরে পাহাড়ের ঝিরি পথে হেঁটে যেতে যেতে সুমধুর পাখির কলরব আপনার মনকে ভাললাগার অনুভূতিতে ভরিয়ে দেবে। দূর থেকে কানে ভেসে আসবে বিপন্ন বনমানুষের ডাক। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর শুরুতে আপনার দু’চোখের সামনে ভেসে উঠবে পাহাড় থেকে ধোঁয়ার মতো ঘন কুয়াশা ভেসে উঠার অপূর্ব দৃশ্য। মনে হবে যেন ওই নয়নাভিরাম পাহাড় আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এভাবেই হাটতে হাটতে একসময় আপনি পৌঁছে যাবেন আপনার কাঙ্খিত হামহাম জলপ্রপাতের খুব কাছাকাছি।
কিছু দূর এগুলেই শুনতে পাবেন হামহাম জলপ্রপাতের শব্দ। কাছে গিয়ে দেখতে পাবেন প্রায় ১৬০ ফিট ওপর হতে আসা জলপ্রপাতের সেই অপূর্ব দৃশ্য । প্রবল ধারায় উপর হতে গড়িয়ে পরছে ঝর্নার পানি নিচে থাকা পাথরের উপর। পাথরের আঘাতে জলকনা বাতাসে মিলিয়ে গিয়ে তৈরি করছে কুয়াশা। চারিদিকে এক শীতল শান্ত পরিবেশ। ডানে বামে চোখ ফেরানোর উপায় নেই। কেবলই ইচ্ছে করবে তাকিয়ে থাকি সৃষ্টিকর্তার এই অনন্য সৃষ্টির জন্য। কাঁচের মত স্বচ্ছ পানি পাহাড়ের শরীর বেঁয়ে আছড়ে পড়ছে বড় বড় পাথরের গায়ে, গুড়ি গুড়ি জলকনা আকাশের দিকে উড়ে গিয়ে তৈরি করছে কুয়াশার আভা। বুনোপাহাড়ের দেড়শ ফুট উপর হতে গড়িয়ে পড়া স্রোতধারা কলকল শব্দ করে এগিয়ে যাচ্ছে পাথরের পর পাথর কেটে সামনের দিকে তার গন্তব্যে। চারিপাশ গাছ গাছালি আর নাম না জানা হাজারো প্রজাতীর লাত পাতা ও লতা গুল্মে আচ্ছাদিত হয়ে আছে পাহাড়ী শরীর। স্রোতধারা সে লতাগুল্মকে ভেদ করে গড়িয়ে পড়ছে ভুমিতে। তৈরি করছে স্রোতস্বিনী জলধারা। সে যে কি এক বুনোপরিবেশ না দেখলে বিশ্বাস করানো সম্ভব নয়।
যেভাবে যেতে হবেঃ
প্রথমেই আপনাকে যেকোন স্থান হতে গিয়ে পৌছতে হবে শ্রীমঙ্গল কিংবা সরাসরি মৌলভীবাজার। সেখান হতে কমলগঞ্জ। ট্রেনে করে আপনি যেতে পারেন শ্রীমঙ্গল। সেখান থেকে জিপ রিজার্ভ করে কলাবনপাড়া। ভাড়া পড়বে ২০০০-২৫০০ টাকা। মৌলভীবাজার হয়ে যেতে চাইলে প্রথমেই যেতে হবে কমলগঞ্জ। এটি মৌলভীবাজারের একটি উপজেলা। কমলগঞ্জ হতে আদমপুর বাজার পর্যন্ত বাস ভাড়া পড়বে ১০-১৫ টাকা। সেখান থেকে ২০০-২৫০ টাকা ভাড়ায় সিএনজি যোগে আপনি অনায়াসে পৌঁছে যেতে পারেন আদিবাসী বস্তি তৈলংবাড়ী কিংবা কলাবন বস্তি পর্যন্ত । সেখান থেকে আরও প্রায় ৮ কিঃমিঃ পথ পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেলেই দেখা মিলবে কাংখিত সেই হামহাম জলপ্রপাতের। যেভাবেই যান না কেন গহীন অরন্যে প্রবেশের পূর্বে তৈলংবাড়ী কিংবা কলাবন বস্তির আদিবাসীদের সাহায্য নিয়ে আপনাকে ট্রেকিং করতে নামতে হবে। প্রায় ৮ কিমি. দুর্গম পাহাড়ের গায়ে হামহাম জলপ্রপাতে আপনি যেতে পারেন ঝিরি পথে অথবা টিলা পথে। ঝিরি পথ মুগ্ধ করবে আপনাকে। তবে ঝিরি পথে সময় কিছু বেশি লাগতে পারে। টিলা পথে হামহাম যেতে সময় লাগে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘন্টা। ঝিরি পথে ফিরে আসতে সময় লাগবে ৪ থেকে সাড়ে ৪ ঘন্টা।
উচু নিচু পাহাড়া আর টিলা, বুনো জঙ্গল, পাথুরে আর কদর্মাক্ত পথ, কোথাও হাটু সমান আবার কোথাও কোমর সমান ঝিরিপানি। শুধু তাই নয় এই দুর্গম পথ পাড়ি দিতে গিয়ে আপনার প্রবল শত্রু হিসেবে পেয়ে যাবেন অসংখ্য বন্য মশা মাছি এবং রক্তচোষা জোক। এই পথ পাড়ি দিয়েছে অথচ কেউ জোকের কবলে পড়েনি এমনটি ভাবা স্বপ্নবিলাশ। পাহাড়ী পথ মারাতে গিয়ে আপনাকে ঘাম ঝড়াতে হবে, পরিশ্রান্ত হতে হবে, কখনো পিছুহটতে মন চাইবে। খাদ্য আর পানীয়র অভাব আপনাকে অসহায় করে তুলতে পারে। তারপরও সৌন্দর্য পিপাষুদের অদম্য ইচ্ছার কাছে এইসবের কোন কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনা।
হামহাম যাবার জন্য সাথে একজন গাইড নিয়ে যাওয়া অত্যাবশ্যক। কারন প্রথমবার যারা যাবেন তাদের জন্য রাস্তা ভুল করাই স্বাভাবিক। কলাবন গিয়ে একজন গাইড সাথে নিয়ে নিবেন। তাকে ৩০০-৪০০ টাকা দিতে হবে। ট্রাকিং করার সময় সবার হাতে একটি বাশ বা লাঠি নিয়ে নিবেন। এটি আপনার ভারসাম্য রক্ষা করতে, হাটত এবং সাপ বা অন্যান্য বন্যপ্রাণী হতে নিরাপদ রাখবে। সাথে সরিষার তেল আর লবণ নিয়ে নিবেন । জোকে ধরলে লবন দিয়ে কোন কিছু দিয়ে ফেলে দিবেন। দুপুরে খাবার জন্য হালকা শুকনা খাবার নিয়ে যাবেন। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ডেটল, নাপা ,তুলা এগুলো নিয়ে নিতে পারেন। থ্রি কোয়াটার্র টাইপের প্যান্ট আর টিশার্ট পরে যাবেন জুতা হিসেবে কেডসের তুলনায় প্লাস্টিকের স্যান্ডেল বেশ কাজে দেয়। নাজুক টাইপের মেয়েদের এই রাস্তাতে না নেওয়াই ভালো। বর্ষাকালে ঝর্নার প্রকৃতরূপ টা দেখা যায়। তবে সেক্ষেত্রে যাবার রাস্তায় কষ্টও বেশী হবে। শীতকালে রাস্তায় তেমন পানি থাকেনা বলে যাওয়াটা একটু সহজ। কিন্তু শীতে অধিকাংশ ঝরনাতেই একদম পানি থাকে না। সেটা দেখাও খুব একটা সুখকর নয়। সুতরাং কষ্ট হলেও বর্ষাকালেই যাওয়া উচিত।
হামহাম ঝর্নাস্থলে পৌছে খুব বেশীক্ষন উপেভাগ করার উপায় নেই। কেননা সেখানে বেশীক্ষন অবস্থানের কারলে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলে পাহাড়ে ঘনকালো অন্ধকারে রাস্তা হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা শতভাগ। অপরদিকে বন্যপ্রাণীদের আক্রমনেরও শিকার হতে পারেন। ঢালু ও পিচ্ছিল পাহাড়ী পথ বেয়ে উপরে ওঠা কষ্ট হলেও সহজ, কিন্তু পাহাড় হতে নিচে নেমে আসা খুবই বিপজ্জনক ও কঠিন। তাই ঝিরি পথে এসে সবাইকে কাছাকাছি থেকে খুবই সন্তর্পনে ট্রেকিং শুরু করতে হবে। প্রায় চারঘন্টা পর আপনি ফিরে আসবেন সেই কলাবনে। অতঃপর সেখানে আদিবাসী বস্তিতে রাত্রিযাপন নতুবা ঘরে ফেরার পালা।

Loading Facebook Comments ...
Top