নগর মাঝির জীবন | Bahumat

নগর মাঝির জীবন

নগর মাঝি

নদীমাতৃক বাংলাদেশের ব্যাস্ততম নদী বুড়িগঙ্গা। এর বুকে প্রতিদিন অসংখ্য নৌযান চলাচল করে। রাজধানী ঢাকার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কারণে তা অধিক ব্যাস্ত। বিবিসির প্রতিবেদন মতে বিশ্বের ব্যাস্ততম নদী পারাপারগুলির মধ্যে ঢাকার বুড়িগঙ্গার সদরঘাট অন্যতম প্রধান একটি খেয়া পারাপার। নদীর পূর্ব পাড় সদরঘাট এবং পশ্চিম পাশ কেরাণীগঞ্জ। এই ব্যাস্ততম পারাপারের সুবিধার্থে প্রতিদিন কয়েকশ ডিঙ্গি নৌকা ভাড়া খাটে। তাতে করে যাত্রীদের যেমন সময় বেচে যায়, তেমনি খরচও হয় তুলনামূলক কম। আর এই সুবিধাজনক ব্যবস্থাটির পেছনে সব থেকে বড় অবদান মাঝিদের। আবহমান কাল থেকে ‘মাঝি’ শব্দটি বাংলার অন্যতম পেশা হিসেবে পরিচিত। তাদের নিয়ে রচিত হয়েছে উপন্যাস, ছোট গল্প, নাটক, সিনেমা; আর গানের কথা তো বলাই বাহুল্য। বাংলা লোকসঙ্গীতের ভান্ডারে বৃহৎ এক জায়গা করে আছে মাঝি মাল্লাদের জীবন সংগ্রামের কথা। সুতরাং, এই পেশা বাংলার সংস্কৃতির বিশেষ এক অনুষঙ্গও বটে। সদরঘাট-কেরাণীগঞ্জ রুটে চলাচলকারী নগর মাঝিদের জীবনচিত্র কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করলে উঠে আসে সংগ্রাম, বঞ্চনা ও না পাওয়ার কত শত কথাএক সময়ে অনেক চওড়া থাকলেও বুড়িগঙ্গার প্রসস্ততা বর্তমানে অনেক কমে এসেছে। সেই সাথে সদরঘাট-কেরাণীগঞ্জ রুটের দৈর্ঘ্য এসে ঠেকেছে তিনশ মিটারে। ব্যাস্ত সদরঘাট থেকে দৈনিক শত শত লঞ্চ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করে। একইভাবে দৈনন্দিন কাজের প্রয়োজনে এপাড় থেকে ওপাড় যাতায়াত করে লক্ষ লক্ষ মানুষ, যার মধ্যে বৃহৎ এক অংশের অবলম্বন ডিঙ্গি নৌকা। তার প্রধান কারণ সেতুগুলির অবস্থান বেশ দূরে। দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা লঞ্চ, বার্জ ও ছোট কার্গো জাহাজ চলাচল করে। বলা যায় নদীজুড়ে এদেরই রাজত্ব। তারই ফাঁক ফোকড় দিয়ে যাত্রী পারাপার করে ডিঙ্গি নৌকাগুলি। দু’একটি নৌকা ডুবে যওয়ার ঘটনা এখানে নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা। কখনও মুখোমুখি সংঘর্ষে, কখনও স্রোতের তোড়ে আবার কখনও বা ঢুকে যায় লঞ্চ অথবা জাহাজের নিচে। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি উদ্ধার কাজে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাবস্থা নেই। আজ পর্যন্ত মাঝিরা স্ব-উদ্যোগেই সে দায়িত্ব পালন করে আসছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা অন্যের প্রাণ রক্ষা করে। বিনিময়ে তারা কোন কিছু প্রত্যাশা কখনও করে না।কথা হয় ২৬ বছরের তরুণ মাঝি মো. জায়েদের সাথে। মায়ের চিকিৎসা করাতে বাবার রেখে যাওয়া শেষ সম্বল দুই বিঘা জমি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছে। জীবন বাঁচানোর তাগিতে চলে আসতে হয়েছে ঢাকায়। ঠেলা চালানো, রিক্সা চালানো থেকে কুলি গিরি, কি করেন নি? সব শেষে দুই বছর আগে বেছে নেন মাঝির জীবন। দৈনিক ঘাটের চাঁদা ৮৫ টাকা এবং নৌকার ভাড়া হিসেবে মহাজনকে পরিশোধ করতে হয় ৭০ টাকা। খুচরা ভাড়া জনপ্রতি ৫ টাকা এবং রিজার্ভ ২০ টাকা। প্রতিদি ৪৫ থেকে ৫০ বার এপাড় ওপাড় করতে হয়। সমস্ত খরচা বাদে দিন গেলে সাড়ে তিন থেকে চারশ টাকা পকেটে নিয়ে ঘরে ফিরতে পারে।বিপজ্জনক পথ, দূষিত পানির দুর্গন্ধ সব মিলিয়ে জায়েদের মত সকল মাঝির জীবন ও স্বাস্থ্য প্রতিনিয়তই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। প্রচন্ড পরিশ্রমের কাজ, কেবল পরিবারের সদস্যদের মুখের কথা ভেবে করে যেতে হয়। আর কত দিন করে যেতে হবে, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের এই দেশে তা অন্যান্য মাঝির মত জায়েদেরও প্রশ্ন। ছোট তিন ভাই বোনকে নিয়ে তার সংসার। অর্থের অভাবে ভাই বোনদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারেন না, এমন কি অসুস্থ্য মায়ের উপযুক্ত চিকিৎসাও করাতে পারে না। কোনো মতে মাথা গোজার জন্য বস্তিতে ভাড়া নিয়েছে একটি ছোট্ট ঘর। সকলকে নিয়ে তার মধ্যেই গাদাগাদি করে থাকতে হয়। অভাবের কারণে নিজের পড়াশোনা হয়নি কিন্তু ভাই বোনদের পড়াশোনা না করাতে পেরে তার দুঃখের অন্ত নেই। চোখের পানি আড়াল করতে করতে বলেন, কঠিন পরিশ্রম; তার উপর দিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর সার্বক্ষণিক জীবনের ঝুঁকি তো আছেই। বোধহয় অকালেই মরে যেতে হবে। তখন ভাই বোনদের ভাগ্যে কি ঘটবে!জায়েদের মত অনেক মাঝি রয়েছে যাদের ঘর সংসার বলতে ঐ নৌকা। অর্থাৎ সারাদিন খ্যাপ মেরে নৌকাতেই ঘুমায়। যখন জানতে চাওয়া হল, গ্রামে চলে যেতে ইচ্ছা করে না? উত্তরে বলেন, গ্রামে কিছুই নেই তবুও মন সব সময় পড়ে থাকে সেখানে। সুযোগ পেলে কে না যেতে চায়! অন্তত দুইটি গরু কেনার মত সামর্থও যদি থাকত তাহলে এখানে পড়ে থাকতাম না। সকলকে নিয়ে কবেই পাড়ি দিতাম। ভাই বোনদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিতাম। কিন্তু কি করব সারা মাসে যা উপার্জন করি তা থেকে-খেয়েই শেষ। গরু কিনবো কি দিয়ে? নিশ্চিত ও নিরাপদ এক সুন্দর ভবিষ্যতের পাশাপাশি জায়েদ এবং জায়েদের মত অনেকেরই আপাতত চাওয়া, দূষণ মুক্ত বুড়িগঙ্গা, আর সেই নদীতে নির্বিঘ্নে নৌকা চালানোর পরিবেশ।

Top