পার্ট টাইমার ডিসি | Bahumat

পার্ট টাইমার ডিসি

পুরনো জেলাগুলোর ডিসির বাংলোই বলে দেয় আসলে একজন ডিসি ওই জেলার কে? এখন অবশ্য পুলিশ প্রশাসনে অনেক পরিবর্তন এনে আগের সেই ডিসি আর নেই। তারপরেও ডিসি মানেই তিনি ওই জেলার অনেক কিছু। একজন ডিসিকে কখনোই ধরে নেওয়া হয় না তিনি কেবল মাত্র ওই জেলার জেলা প্রশাসক। তা যদি মনে করা হয়, তাহলে যে কারণে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে এই ইউনিটটি তৈরি হয়েছিলো তা আর থাকে না।
যতদূর জানি সম্প্রতি ডিসি লিস্ট তৈরি করার সময় সরকারের পক্ষ থেকে- বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো, ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে যেন প্রায়োরিটি দেওয়া হয়, তিনি ওই জেলায় সার্বক্ষণিক তার পরিবার নিয়ে থাকবেন। সপ্তাহের পাঁচ দিন বা চার দিন থাকবেন আর ঢাকায় বাসা মেইনটেইন করবেন এদের যেন ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া না হয়।
বাস্তবে ডিসিকে কেন জেলায় থাকতে হয়? ডিসি যে শুধু ওই জেলায় থাকবেন তা নয়, ডিসিকে বাস্তবে ওই জেলার এমন একজন হতে হয় যার হাত ধরে ওই জেলার সামাজিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক সকল উন্নয়ন হয়। প্রশাসনে আসার পরে প্রায় সকলে ডেপুটি সেক্রেটারি হতে পারেন, অনেকে এডিশনাল সেক্রেটারি হতে পারেন। তবে সচিব ও জেলা প্রশাসক সবাই হতে পারেন না। সচিব ও জেলা প্রশাসক শুধু নির্বাহী বা প্রশাসক নন তাকে একজন স্বপ্নদ্রষ্টা হতে হয়।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ দুজনকে কলকাতা করপোরেশনের মেয়র হতে বলেছিলেন। একজন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস অন্যজন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এর কারণ, একটি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গেলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতকে পরিচালনা করতে হয়, কেউ যদি প্রকৃত আন্তরিকভাবে মেয়র হন তাহলে তিনি দেখতে পাবেন সিটি করপোরেশনের ভেতর ছোট একটি রাষ্ট্র আছে। এখানে রাষ্ট্র পরিচালনার হাতে খড়ি হয়। দেশবন্ধু তার এই দুই স্নেহভাজনকে ভবিষ্যত রাষ্ট্রপরিচালক হিসেবে তৈরি করার জন্যে এমনটি চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রের মূল নির্বাহী যেমন সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ তেমনি রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে নির্বাহীকেও যোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ হতে হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে অনেক বড় নির্বাহী তার প্রমাণ তিনি ডিসি লিস্টের অন্যতম বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যিনি ডিসি হবেন তিনি ওই জেলাতে সার্বক্ষণিক থাকবেন। কেন সার্বক্ষণিক থাকতে হবে? এটাই কিন্তু মূল প্রশ্ন। সার্বক্ষণিক থাকতে হবে এ জন্যে যে ওই জেলা প্রশাসককে আগে ভালো করে চিনতে হবে ওই জেলাটিকে। তারপরে তাকে ওই জেলার উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে। যদিও আমাদের অর্থমন্ত্রীর স্বপ্ন- জেলায় জেলায় বাজেট এখনও বাস্তবায়ন হয়নি, তারপরেও জেলা বাজেট আছে। আর শুধু বাজেট নয়, কোনও ডিসি যদি স্বাপ্নিক হন, তিনি যদি তার জেলাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন তাহলে সে উন্নয়ন অন্তত বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক নীতিতে করা সম্ভব নয় – এটা ঠিক নয়। তাছাড়া একজন ডিসিকে হতে হয় তার জেলার সামাজিক, অর্থনৈতিক কাজের একজন নেতা। এই নেতৃত্বের গুণটিই তাকে অন্য দশজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে ভিন্ন করে। তাকে ডিসি হিসেবে নিয়োগ পেতে সহায়তা করে। ভালো নেতৃত্বের গুণাবলীর অধিকারী ছাড়া কেউ কখনও একজন ভালো ডিসি হতে পারেন না। একজন ডিসি এমনও হবেন, তার স্বপ্ন থাকবে তার জেলা থেকে যেন অন্তত দু’জন ফুটবলার জাতীয় দলে চান্স পায়, অন্তত একজন ক্রিকেটার জাতীয় দলে খেলতে পারে। এ স্বপ্নটি দেখে- এ পথেও তাকে কাজ করতে হয়। এমনকি তাকে সে কাজটিও করতে হবে যাতে তার জেলায় স্কুলে স্কুলে সংস্কৃতি কর্মী জন্ম নেয়।

বর্তমানে ডিসিদের জেলায় সার্বক্ষণিক না থাকার একটি বড় কারণ, তাদের ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর জন্যে জেলায় জেলায় ভালো স্কুল নেই। সকলকে উত্তরা মডেল, ভিকারুনন্নেসা এই সব স্কুলের ওপর ভরসা করে ঢাকায় বাসা রেখে স্ত্রীকে এখানে রেখে যেতে চান। আর কোনও ক্রমে পাঁচদিন চাকরি করে ঢাকা মুখো হতে হয় তাদের। আমাদের আজকের তরুণ যারা এই ডিসি তারা কিন্তু একবার ভেবে দেখতে পারেন এই সমস্যার সমাধান তার হাতেই। একদিন এ দেশের সব জেলা স্কুলের মান সমান ছিল। ঢাকা জেলা আর রংপুর জেলার স্কুলের মধ্যে কোনও পার্থক্য ছিল না। কেন পুরনো জেলা স্কুলগুলোর মান নেমে গেলো? কেন নতুন জেলার স্কুলগুলো ঢাকার স্কুলের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না? এর জন্যে অনেক খানি দায়ী ডিসি সাহেব। তিনি মনোযোগ দিচ্ছেন না, তিনি স্বপ্ন দেখছেন না- তাই পুরনো স্কুলগুলোর মান নেমে যাচ্ছে, নতুন জেলা স্কুল গুলো ভালো হচ্ছে না। ঢাকায় যদি ল্যাবরেটরি স্কুলকে পেছনে ফেলে উত্তরা মডেল স্কুল এগিয়ে যেতে পারে তাহলে শেরপুর জেলা স্কুল কেন উত্তরা মডেলকে পেছনে ফেলতে পারবে না? কেন ডিসি সাহেব সে চ্যালেঞ্জ নেন না। আগে অনেক ডিসিকে দেখেছি, নিজের শতটি কাজের ফাঁকে জেলা স্কুলে গিয়ে ইংরেজি ক্লাস নিচ্ছেন। এখন কেন সে তদারকি নেই।

এমনিভাবে শুধু শিক্ষা নয়, স্বাস্থ্য, কৃষি, সংস্কৃতি, খেলাধুলা সহ নানান দিক এগিয়ে নিতে পারেন ডিসিরা। তাছাড়া ডিসির পাশাপাশি ডিসির স্ত্রী -যদি তিনি অন্য কোনও পেশায় না থাকেন বা থাকলেও তিনিও বিভিন্ন সময়ে ওই জেলার নানান সামাজিক দিক এগিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারেন। কারণ ডিসির স্ত্রী কিন্তু এক অর্থে ওই জেলার ফার্স্ট লেডি। নানান সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার অবদান রাখার সুযোগ আছে। আগে এক সময়ে ডিসির স্ত্রী সে কাজটি করতেন।

অনেকে বলতে পারেন যে সময়ে ডিসির বাংলো তৈরি হয়েছিলো সে সময়ের থেকে বর্তমান সময় বদলে গেছে। এখন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আছেন, সংসদ সদস্যরা আছেন- তাই এখন ডিসিরা আর অত গুরুত্বপূর্ণ নেই। কথাটি মোটেই সঠিক নয়। কারণ, যে সময়ে ডিসির বাংলো তৈরি হয়েছিলো সে সময়ে আমরা একটি উপনিবেশ ছিলাম আর আজ সব কিছু আমাদের।  এ সময়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক উন্নয়নের এত বেশি শাখা প্রশাখা- যার প্রতিটি অঙ্গে অনেক কাজ। তাই জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য ও ডিসি ও তাদের সঙ্গে জেলার নানান গুনীজন মিলে গোটা জেলাকে এগিয়ে নেওয়ার হাজারটি কাজ তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। শুধু যে কাজগুলো দেখা যায় সেগুলো করার জন্যে একজন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, একজন সংসদ সদস্য বা একজন ডিসি নন। এদের সকলকে স্বপ্ন দেখতে হবে। নতুন কাজের ও উন্নয়নের দিগন্ত উন্মোচন করতে হবে। প্রত্যেককে এমন একটি প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে আমি এমন কিছু কাজের সূচনা করবো যাতে এ জেলার মানুষ শুধু নয়, দেশের মানুষ বলবে ওই কাজটি অমুক শুরু করেছিলেন।

তবে যখনই কেউ ধরে নেবেন তাকে সপ্তাহে একবার ঢাকায় যেতে হবে তখনই তিনি পার্ট টাইমার হয়ে গেলেন। আর সত্যি অর্থে কেউ যদি কাজের সঙ্গে একাত্ম না হন, তিনি কখনই সফল হবে না। শেখ হাসিনা এই পার্ট টাইমার ডিসি বন্ধ করতে চেয়েছিলেন? পেরেছেন কি? মনে হয় পারেননি। এখনও বেশি ক্ষেত্রে পার্ট টাইমার ডিসি।

Loading Facebook Comments ...
Top