সিইসির ‘কৌশল’ ও আশাবাদী বিএনপি | Bahumat

সিইসির ‘কৌশল’ ও আশাবাদী বিএনপি

bnp pic

কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে যখন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয় তখন বিএনপি তাকে স্বাগত জানায়নি। এই নির্বাচন কমিশন সরকারের ইচ্ছা পূরণ করবে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। তবে এটাও ঠিক যে বিএনপি নির্বাচন কমিশন মানি না– এমন কথাও বলেনি। বিএনপি এটা জানে যে সরকার যা করবে, তাই হবে। তারা দাবি করে কিছু আদায় করতে পারবে না। বিএনপির আন্দোলন করার রেকর্ড থাকলেও সাফল্যের রেকর্ড নেই। তাই নুরুল হুদার নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন কমিশন নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সত্ত্বেও বিএনপি কমিশনের ডাকে গত ১৫ অক্টোবর সংলাপে অংশ নিয়েছিল

বিএনপির এই সংলাপে যাওয়াকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। মুখে যাই বলুক না কেন, আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ নিয়ে আর সম্ভবত খুব অনিশ্চয়তা নেই।
সরকারও মনে করছে না যে কোনও অজুহাত তুলে বিএনপি আগামী নির্বাচন থেকে দূরে থাকবে। গত ১৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ ও উপদেষ্টামণ্ডলীর এক যৌথ সভায় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচন আর আগামী নির্বাচন এক হবে না। বিএনপি নির্বাচনে আসবে এবং কঠিন নির্বাচন হবে’। বিএনপি নির্বাচনে এলে সে নির্বাচনে যে আওয়ামী লীগের সহজ জয় সম্ভব হবে না– এটা সবাই বুঝতে পারছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপলব্ধিতেও সেটা আছে। সারা দেশে বিএনপি-জামায়াতের পক্ষ থেকে সুকৌশলে এই কথাটা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না। যারা এই মুখস্ত বাক্যটি এক নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করেন, তাদের যদি প্রশ্ন করা যায়, আওয়ামী লীগ যদি না জেতে তাহলে কে জিতবে? বিএনপি? বিএনপির শাসনামল কি আওয়ামী লীগের চেয়ে ভালো ছিল? আওয়ামী লীগের বিকল্প কি বিএনপি?

এ সব প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে তারা বলার চেষ্টা করেন, আমাদের দেশের মানুষ পরিবর্তন পছন্দ করে। এক দলকে টানা ক্ষমতায় দেখতে চায় না। আওয়ামী লীগ যেহেতু টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় আছে, সেহেতু পরেরবার মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে যাবে। এটা কিন্তু সম্পূর্ণ একটি মনগড়া ধারণা। এটা হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। এই অনুমানের ওপর বিএনপিরও পরিপূর্ণ আস্থা আছে বলে মনে হয় না। তাই তারা একটি রেকর্ড বাজিয়েই চলেছে যে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। তারা নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার চাচ্ছে। কিন্তু তাদের এই দাবি পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। আগামী নির্বাচন বর্তমান সরকারের অধীনেই হবে- সরকারের পক্ষ থেকে এটা বেশ জোর দিয়েই বলা হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে কি সত্যি বিএনপি অংশ নেবে না? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য বিএনপি বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার কথা বলবে, জনমত গঠনের চেষ্টা চালাবে, বিদেশি ‘মিত্র’দের দিয়ে সরকারের কাছে দেন-দরবার করবে। এসবে সরকার নরম হবে না। তাই শেষ পর্যন্ত নিরূপায় বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। আর বিএনপি অংশ নেওয়া মানেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন, যেটাকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘কঠিন’ নির্বাচন। কঠিন শুধু আওয়ামী লীগ বা সরকারের জন্য নয়, বিএনপির জন্যও কঠিন। বিএনপিকে নির্বাচনের আগে বেশ কিছু বাধা অতিক্রম করতে হবে। প্রথমত দল গোছাতে হবে। বিএনপি এখন সাংগঠনিকভাবে এলোমেলো অবস্থায় আছে। মূল দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি পুনর্গঠন প্রতিক্রিয়া শেষ হয়নি। বিএনপিতে কোন্দল আছে, আছে সন্দেহ-অবিশ্বাস। দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় না থাকায় দলের আর্থিক সক্ষমতাও দুর্বল হয়েছে বলে মনে করা হয়।

বিএনপির জন্য বড় বাধা – নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা। দলীয় প্রধান থেকে শুরু করে অনেকের বিরুদ্ধেই অনেক মামলা আছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুটি দুর্নীতি মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পথে। অনেকেই মনে করছেন, ওই দুই মামলায় খালেদা জিয়া দণ্ডিত হবেন। দলের প্রধান কারাগারে গেলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, সে বিষয়ে আগাম মন্তব্য করা যাবে না। তবে এটা ঠিক, বিএনপি নেতারা ‘ভবিষ্যৎ’ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আছেন।

দুই.

এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও পরাজিতের মানসিকতা নিয়েই নির্বাচন কমিশনের সংলাপে গিয়েছিলেন বিএনপি নেতারা। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে ১৭ সদস্যের প্রতিনিধি দল সংলাপে অংশ নিয়ে ২০ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। বিএনপির উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলো হলো: মেয়াদ শেষের ৯০ দিন আগে জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান, এখন থেকেই সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ তৈরি, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণ, প্রতিরক্ষা বাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে ভোটের অন্তত সাত দিন আগে মোতায়েন করা, ই-ভোটিং না রাখা, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সব কমিশনারকে অন্তর্ভুক্ত করা, সংসদীয় আসনের সীমানা ২০০৮ সালের আগের অবস্থায় নিয়ে যাওয়া – ইত্যাদি।

বিএনপির অনেক প্রস্তাব কিংবা দাবি রাজনৈতিক এবং এগুলোর ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের কিছুই করার নেই। বিএনপির এক নম্বর দাবি হলো সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান। সংসদ ভেঙে দিয়ে সহায়ক সরকারের অধীন নির্বাচন করা বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সম্ভব নয়। এটা করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। আগামী নির্বাচনের আগে সংবিধান সংশোধন হবে – এমন বাস্তবতা দেশে আছে কি? রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের সংলাপের সম্ভাবনাও আছে বলে মনে হয় না। নিউইয়র্কে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই সে সম্ভাবনা একেবারেই বাতিল করে দিয়েছেন। বিএনপি সঙ্গে সরকার কোনও আলোচনায় বসবে না– এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনেরও কিছু করার নেই।

বিএনপি এসব জানে। সংলাপ শেষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশনের খুব বেশি কিছু করার ক্ষমতা নেই। তারপরও এই সংলাপের পর বিএনপি কিছুটা আশাবাদী। বিএনপির এই আশাবাদের কারণ কী? কারণ হলো, বিএনপির সঙ্গে সংলাপে বসে স্বাগত বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিএনপির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। বলেছেন, জিয়াউর রহমান এদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে প্রকৃত নতুন ধারার প্রবর্তন করেছে। এছাড়াও খালেদা জিয়ার শাসনামলের কিছু কাজের উল্লেখ করে তিনি প্রশংসা করেছেন।

সিইসি’র এই অপ্রত্যাশিত উদারতায় বিএনপির আশাবাদী হওয়ারই কথা। আওয়ামী লীগ তথা সরকার যেখানে জিয়াউর রহমানকে গণতন্ত্র হত্যাকারী ও অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী বলে মনে করে, উচ্চ আদালতের একাধিক রায়েও জিয়া সম্পর্ক এরকম মন্তব্যই করা হয়েছে – সেখানে একটি সাংবিধানিক পদে থেকে সিইসি উল্টো গীত গেয়ে বিএনপিকে ‘আশাবাদী’ করতে পারলেও রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক উস্কে দিলেন। কেউ কেউ মনে করছেন, সিইসি সম্ভবত চোখ থাকতেও অন্ধ। জিয়া, খালেদা জিয়া, বিএনপি সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করার আগে তাকে সরকারের মনোভাব বোঝা দরকার ছিল। তার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী একজন ব্যক্তি আদালতের রায় সম্পর্কে অবহিত নন, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? সরকারের মনোভাব না হয় তিনি তোয়াক্কা করলেন না, কিন্তু আদালতের রায় অমান্য করার সুযোগ তার আছে কি?

কেন তিনি হঠাৎ বিএনপিকে তোয়াজ করতে গিয়ে সরকারকে বিব্রত করতে গেলেন? আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সিইসি জিয়াউর রহমানকে নিয়ে যেসব কথা বলেছেন, তা বিএনপিকে নির্বাচনে আনার কৌশলও হতে পারে। সেজন্য বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে বেশ খুশি খুশি লাগছে। নির্বাচন পর্যন্ত ওই ‘খুশি খুশি’ ভাব থাকলেই হয়।

ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য তাৎপর্যহীন নয়। সরকারি দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই নেতা নির্বাচন পর্যন্ত বিএনপির খুশি খুশি ভাব বজায় থাকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে কি বিশেষ কোনও বার্তা দিলেন? সিইসি’র জিয়া বা বিএনপি বন্দনাই শেষ কথা নয়। এই দিন দিন নয় আরও দিন আছে। সিইসি যদি ‘কৌশল’ হিসেবেও জিয়ার প্রশস্তি করে থাকেন, তাহলেও এটা বলতে হবে যে তিনি ভঙুর কৌশলের আশ্রয় নিয়ে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতার বড় ধরনের সংকট তৈরি করলেন। এখন তিনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি- দুই দলের কাছেই সন্দেহভাজন হয়ে গেলেন। ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের কাছে আওয়ামী লীগ কোনও অনুগ্রহ বা সুবিধা আশা করে না। নিরপেক্ষতা আশা করে।

দুই দলের কাছে ‘নিরপেক্ষতা’র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া খুব সহজ কাজ কি? সিইসিকে নিয়ে নতুন ‘নাটক’ হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না!

 

Loading Facebook Comments ...
Top