নিজস্ব প্রতিবেদক:
নদীমাতৃক বাংলাদেশের একটি ভয়াবহ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে নদীভাঙন। বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন যেমন ভয়াবহ রূপ নেয়, তেমনি সারা বছর ধরেই চলে নানা মাত্রার ক্ষয়। দেশের উত্তর, মধ্যাঞ্চল এবং উপকূলীয় এলাকায় নদীভাঙন এখন নিছক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এক স্থায়ী মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর নদীগর্ভে বিলীন হয় প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমি। ২০২৫ সালের বর্ষা মৌসুমে দেশের ১২টি জেলায় প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমি এবং ২০ হাজারের বেশি মানুষ গৃহহীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে যমুনা, গঙ্গা ও পদ্মা অববাহিকায় অবস্থিত এলাকাগুলো।
কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইলসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর নদীতীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে ইতোমধ্যে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা নদী এবং তাদের উপনদীতে ভাঙনের ফলে শত শত ঘরবাড়ি, আবাদি জমি এবং অবকাঠামো নদীতে বিলীন হয়েছে।
বিশেষ করে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি এবং কুড়িগ্রামের চিলমারী, উলিপুর ও রৌমারীতে বিপর্যয়কর ভাঙন দেখা গেছে।
মানিকগঞ্জে পদ্মা, যমুনা, ধলেশ্বরীসহ ১৪টি নদীর প্রবাহে প্রতিবছরের মতো এবারও শুরু হয়েছে তীব্র নদীভাঙন। ইতোমধ্যে ভারাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
ফরিদপুর, রাজবাড়ী, পাবনা, মাদারীপুরেও চলছে ভয়াবহ ভাঙন। স্থানীয় লোকজন জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড বর্ষা শুরু হলে তড়িঘড়ি করে কিছু জিও ব্যাগ ফেললেও তা কার্যকর প্রতিরোধ নয়।
বরগুনা, ভোলা, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পায়রা, বিষখালী, বলেশ্বর ও মেঘনা নদীর তীব্র ভাঙনে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। বরগুনার বেতাগী, আমতলী, তালতলী এবং ভোলার মাঝের চর, লক্ষ্মীপুরের রামগতি এলাকার বহু পরিবার নদীতে ভিটেমাটি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে।
বিশেষ করে ভোলার কাচিয়া ইউনিয়ন এবং লক্ষ্মীপুরের বিবিরহাট সড়ক ভাঙনের মুখে পড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অবৈধভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলন, নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণকে নদীভাঙনের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, “নদীকে গুরুত্ব না দেওয়ায় এবং দুর্নীতিগ্রস্ত অস্থায়ী প্রকল্পের কারণে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকা খরচ করেও কার্যকর সমাধান আসছে না।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাঙন প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নদীশাসন পরিকল্পনা, টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং ভারত-বাংলাদেশ ফারাক্কা সমস্যার কূটনৈতিক সমাধান জরুরি হয়ে পড়েছে। নইলে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ তাদের সহায়-সম্বল হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হবেন।










