খালেদা জিয়ার যে ভাষণগুলো বদলে দিয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টার দিকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটলো।

দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে বেগম খালেদা জিয়া শুধু নেতৃত্ব দিয়েই নয়, তার সময়োপযোগী ও প্রভাবশালী ভাষণের মাধ্যমেও রাজনীতিতে গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তার ভাষণ কখনো রাজপথে আন্দোলনের গতি বাড়িয়েছে, কখনো জাতীয় সংকটে দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম ভাষণটি আসে ১৯৮২ সালের ৭ নভেম্বর। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি সেদিন স্বামীর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। ওই ভাষণেই তিনি জিয়ার আদর্শ ধরে রাখার এবং দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করেন। এটিই ছিল তার রাজনৈতিক যাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা।

নব্বইয়ের দশকে এইচ এম এরশাদের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় খালেদা জিয়ার প্রতিটি জনসভা পরিণত হয় আন্দোলনের অনুপ্রেরণায়। তার ভাষণগুলো রাজপথে ছাত্র-জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে।

১৯৮৬ সালের নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সাত দল, আট দল ও পাঁচ দলীয় জোটের আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভাষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই সময় তার কণ্ঠে ‘স্বৈরাচার বিদায় করো, গণতন্ত্র মুক্ত করো’ স্লোগানটি আন্দোলনের মূলমন্ত্রে পরিণত হয়।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া তার ভাষণটি ছিল ঐতিহাসিক। ওই ভাষণে তিনি রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা বাতিল করে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার অঙ্গীকার করেন, যা পরবর্তীতে বাস্তবায়িত হয়ে দেশের শাসনব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনে।

পরবর্তীতে নবম জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে ২০১৩ সালের জুনে দেওয়া তার দীর্ঘ নীতি নির্ধারণী ভাষণও আলোচিত হয়। সে ভাষণে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পরিহার, জাতীয় নেতাদের যথাযথ সম্মান এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেছিলেন, “আমরা কাউকে খাটো করে দেখতে চাই না… প্রত্যেকের সাফল্য ও ব্যর্থতার বিচার ইতিহাসই করবে।”

২০১৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ের আগের দিন গুলশানে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন ছিল তার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ভাষণ। সেখানে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ন্যায়বিচার হলে তিনি বেকসুর খালাস পাবেন এবং প্রতিহিংসার রাজনীতির পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের আহ্বান জানান।

সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য ভাষণটি আসে ২০২৪ সালের আগস্টে। দীর্ঘদিন কারাবন্দী ও অসুস্থ থাকার পর ছাত্র-জনতার আন্দোলন পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ৭ আগস্ট নয়াপল্টনে বিএনপির সমাবেশে তিনি ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন। সে ভাষণে তিনি প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহার করে ভালোবাসা ও শান্তির ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান।