অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নীতিতে অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার পেলেন দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ

অনলাইন ডেস্ক:

সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নীতির ব্যাষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণার জন্য ২০২৬ সালের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার (আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে সুইডিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুরস্কার) যৌথভাবে পেয়েছেন দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড। আজ স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস এ পুরস্কার ঘোষণা করে।

 

নোবেল কমিটির বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পাদক টমি অ্যান্ডারসন, টিমো বোপার্ট, জন হাসলার ও পার ক্রুসেলের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, অধ্যাপক রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ডের গবেষণা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নীতিতে দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন এনেছে। তাঁদের কাজ ‘নিউ কেইনসীয় মডেল’ বিকাশে অবদান রেখেছে, যা ব্যবসায়িক চক্রের ওপর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নীতির প্রভাব বিশ্লেষণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়গুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে।

 

কেইনসীয় তত্ত্বের ঐতিহাসিক পটভূমি ও সীমাবদ্ধতা

 

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিতে কেইনসীয় অর্থনীতির ব্যাপক প্রভাব ছিল। এর প্রধান বিশ্লেষণী উপকরণগুলোর একটি ছিল ‘ফিলিপস কার্ভ’, যা বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে বিপরীতমুখী সম্পর্ক তুলে ধরে। প্রচলিত পদ্ধতিগুলোতে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের নির্দেশনা হিসেবে প্রায়ই সামষ্টিক অর্থনৈতিক চলকগুলোর মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করা হতো।

 

তবে ১৯৭০-এর দশকের অর্থনৈতিক সংকট এসব ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। এ সময়ে অনেক দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ বেকারত্বের সমন্বয়ে সৃষ্ট ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা মন্দাস্ফীতির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। এ অভিজ্ঞতা অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে প্রচলিত মডেলগুলোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে এবং ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশা ও সিদ্ধান্তকে বিবেচনায় নেয়—এমন পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে।

 

এ প্রেক্ষাপটে নোবেলজয়ী রবার্ট লুকাস যুক্তি দেন, শুধু ওপর থেকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অর্থনীতিকে বোঝা সম্ভব নয়। বরং লাখো ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নেওয়া সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক ফলাফল বিশ্লেষণ করতে হবে। এ ধরনের ব্যাষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে পূর্ণাঙ্গ সামষ্টিক অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করা গবেষকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।

 

রবার্ট ই. হলের অবদান

 

অধ্যাপক রবার্ট ই. হল এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করেন: পারিবারিক ভোগব্যয় ও ভবিষ্যৎ আয় সম্পর্কে প্রত্যাশার মধ্যকার সম্পর্ক। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত এক যুগান্তকারী গবেষণাপত্রে হল স্থায়ী আয়ের অনুমানের অধীনে ভোগব্যয় দৈবচলনধর্মী ধারা অনুসরণ করে এমন একটি ধারণা তুলে ধরেন। এর অর্থ হলো, ভোগব্যয়ের পরিবর্তন শুধু বর্তমান আয়ের পূর্বানুমানযোগ্য পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না; বরং ভবিষ্যৎ সম্পদ সম্পর্কে নতুন তথ্যের দ্বারা তা অনেকাংশে নির্ধারিত হয়।

 

এই কাঠামো ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করে, কেন ভোক্তারা তাঁদের বর্তমান আয় অপরিবর্তিত থাকলেও ব্যয় একই মাত্রায় বজায় রাখতে বা বাড়াতে পারেন, যদি ভবিষ্যৎ সম্পদ সম্পর্কে তাঁদের প্রত্যাশা সে সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে।

 

পরবর্তী সময়ে পারিবারিক ভোগব্যয় নিয়ে গবেষণায় আয় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিবারের প্রতিক্রিয়ার পার্থক্য পরীক্ষা করা হয়েছে। কিছু পরিবার দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাশার ভিত্তিতে ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। অন্যদিকে, ‘হ্যান্ড-টু-মাউথ’ বা বর্তমান আয়ের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল ভোক্তা হিসেবে পরিচিত কিছু পরিবার তাদের বর্তমান আয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে বেশি প্রভাবিত হয়। মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি কীভাবে ভোগব্যয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এ পার্থক্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

 

সামষ্টিক অর্থনীতিতে মাইকেল উডফোর্ডের সমন্বিত কাঠামো

 

২০০৩ সালে প্রকাশিত তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘ইন্টারেস্ট অ্যান্ড প্রাইসেস: ফাউন্ডেশনস অব আ থিওরি অব মনিটারি পলিসি’তে অধ্যাপক মাইকেল উডফোর্ড নিউ কেইনসীয় অর্থনীতির আওতায় মুদ্রানীতি বিশ্লেষণের একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করেন। তাঁর গবেষণায় অর্থনৈতিক তত্ত্ব, পণ্যের মূল্য নির্ধারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আচরণ এবং ভবিষ্যৎ নীতি সম্পর্কে প্রত্যাশাকে এমন একটি কাঠামোয় একীভূত করা হয়েছে, যা আধুনিক মুদ্রা অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

 

ঊনবিংশ শতাব্দীর সুইডিশ অর্থনীতিবিদ নুট উইকসেলের প্রবর্তিত ‘সুদের স্বাভাবিক হার’ ধারণার ভিত্তিতে উডফোর্ড ব্যাখ্যা করেন, সুদের হার পরিবর্তনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কীভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাঁর কাঠামোয় প্রত্যাশা এবং মুদ্রানীতির বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

 

উডফোর্ড আরও বিশ্লেষণ করেছেন, কেন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পণ্যের দাম সব সময় তাৎক্ষণিকভাবে সমন্বিত হয় না। পণ্য ও সেবার দাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যয় বা বাস্তবিক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়। এ ঘটনাকে ‘মূল্যের অনমনীয়তা’ বা ‘প্রাইস স্টিকিনেস’ বলা হয়। মূল্য নির্ধারণের এসব প্রতিবন্ধকতা মুদ্রানীতি কীভাবে উৎপাদন ও মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করে, তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।

 

আধুনিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘উৎপাদন ব্যবধান’ বা ‘আউটপুট গ্যাপ’। এর মাধ্যমে প্রকৃত উৎপাদন ও উৎপাদনের সম্ভাব্য বা টেকসই মাত্রার মধ্যকার পার্থক্য পরিমাপ করা হয়। উৎপাদন ব্যবধান নীতিনির্ধারকদের মূল্যস্ফীতির চাপ মূল্যায়ন এবং উপযুক্ত মুদ্রানীতি নির্ধারণে সহায়তা করে।

 

উডফোর্ডের গবেষণায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য যোগাযোগের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ভোক্তারা ব্যয়, বিনিয়োগ এবং পণ্যের দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ভবিষ্যৎ মুদ্রানীতি সম্পর্কে তাঁদের প্রত্যাশার ওপর আংশিকভাবে নির্ভর করেন।

 

অর্থনৈতিক অভিঘাত ও নিউ কেইনসীয় মডেলের প্রয়োগ

 

অর্থনৈতিক মডেলগুলো বাজারের ভারসাম্য বিঘ্নিত করতে পারে এমন বিভিন্ন ধরনের অভিঘাতের মধ্যে পার্থক্য করে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মতো ইতিবাচক সরবরাহজনিত অভিঘাত উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, কাঁচামাল বা জ্বালানির ঘাটতির মতো নেতিবাচক সরবরাহজনিত অভিঘাত উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে পারে। ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অনুকূল প্রত্যাশা থেকে ইতিবাচক চাহিদাজনিত অভিঘাত সৃষ্টি হতে পারে। বিপরীতে, প্রত্যাশার অবনতি থেকে নেতিবাচক চাহিদাজনিত অভিঘাত দেখা দিতে পারে।

 

নিউ কেইনসীয় কাঠামো নীতিনির্ধারকদের এসব ভিন্ন ধরনের অভিঘাতের ক্ষেত্রে মুদ্রানীতির প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণে সহায়তা করে। উদাহরণস্বরূপ, নেতিবাচক সরবরাহজনিত অভিঘাত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন হ্রাস সীমিত রাখার মধ্যে একটি কঠিন সমন্বয়-সংকট তৈরি করতে পারে। সুদের হার বাড়ানো মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে; তবে উপযুক্ত নীতিগত প্রতিক্রিয়া নির্ভর করে অভিঘাতের ধরন ও স্থায়িত্বের ওপর।

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার কোভিড-১৯ মহামারি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটসহ বড় ধরনের বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে নীতিগত প্রতিক্রিয়া মূল্যায়নে নিউ কেইনসীয় মডেল ব্যবহার করেছে। এসব মডেল সুদের হার, সরকারি ব্যয় ও অন্যান্য নীতিগত পদক্ষেপের পরিবর্তন বিশ্লেষণের উপকরণ সরবরাহ করে। তবে কোনো নির্দিষ্ট নীতিগত পদক্ষেপের কার্যকারিতা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। শুধু এসব মডেলের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে, এগুলো দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক স্থবিরতা কিংবা ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার মতো পরিস্থিতি প্রতিরোধ করেছে।

 

রবার্ট ই. হল ১৯৪৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৭ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। ১৯৫৫ সালে জন্মগ্রহণকারী মাইকেল উডফোর্ড ১৯৮৩ সালে এমআইটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।