নিজস্ব প্রতিবেদক:
জামিন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তি কমাতে দেশের আরও ১২ জেলায় ই-বেইল বন্ড ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এর ফলে দেশের মোট ২৮টি জেলায় সরকারের ডিজিটাল জামিন কার্যক্রম চালু হলো। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সচিবালয় থেকে ভার্চুয়ালি নতুন ১২ জেলার কার্যক্রম উদ্বোধন করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
নতুন যুক্ত হওয়া জেলাগুলো হলো টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কক্সবাজার, চাঁদপুর, রাঙামাটি, সিরাজগঞ্জ, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, হবিগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও ও জামালপুর।
আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রচলিত পদ্ধতিতে একটি জামিননামা বা বেইল বন্ড সম্পন্ন করতে আদালত থেকে কারাগার পর্যন্ত ১২টি ম্যানুয়াল ধাপ পার হতে হতো। ই-বেইল বন্ড ব্যবস্থায় সেই প্রক্রিয়া এখন মাত্র দুই ধাপে সম্পন্ন করা যাচ্ছে। এতে জামিন কার্যক্রম আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও ঝামেলামুক্ত হবে বলে আশা করছে মন্ত্রণালয়।
নতুন ব্যবস্থায় আইনজীবীরা নিজেদের চেম্বার বা যেকোনো স্থান থেকে স্মার্টফোন ব্যবহার করে অনলাইনে বেইল বন্ড দাখিল করতে পারবেন। বেইল বন্ড জমা দেওয়ার পর সেটি গ্রহণ করা হয়েছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে ওটিপির মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ই-বেইল বন্ড চালুর ফলে জামিনপ্রাপ্ত আসামি ও তাদের স্বজনদের কারাগার, ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও জেলা জজ আদালতে বারবার যাতায়াতের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে। সরকারের লক্ষ্য হয়রানিমুক্তভাবে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও সুশাসন নিশ্চিত করা।
মন্ত্রী জানান, এর আগে ১৬টি জেলায় ই-বেইল বন্ড ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। এসব জেলায় গত কয়েক মাসে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার বেইল বন্ড অনলাইনে জমা হয়েছে। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই চতুর্থ ধাপে আরও ১২টি জেলাকে কার্যক্রমের আওতায় আনা হলো।
ই-বেইল বন্ড ব্যবস্থা প্রথম চালু হয় নারায়ণগঞ্জে, ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর। এরপর ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি দ্বিতীয় ধাপে মানিকগঞ্জ, বান্দরবান, মেহেরপুর, জয়পুরহাট, মৌলভীবাজার, পঞ্চগড়, ঝালকাঠি ও শেরপুরে এটি চালু করা হয়। তৃতীয় ধাপে বগুড়া, ঝিনাইদহ, যশোর, মাগুরা, রাজশাহী, নাটোর ও কুষ্টিয়ায় কার্যক্রম শুরু হয়। এ তিন ধাপে মোট ১৬টি জেলা ই-বেইল বন্ডের আওতায় আসে।
আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা বলেন, ই-বেইল বন্ড চালু হওয়া ১৬টি জেলায় জামিননামা দাখিল ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমেছে। নতুন করে আরও ১২ জেলা যুক্ত হওয়ায় জনগণের কাছে এই সেবা আরও বিস্তৃত হবে।
তার ভাষ্য, ডিজিটাল এই ব্যবস্থায় জামিননামা যাচাইয়ে সময় কমবে, বন্দিদের অহেতুক কারাবাস লাঘব হবে এবং বিচার বিভাগের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও বাড়বে।
জামিনের পাশাপাশি মামলার জট কমাতে মেডিয়েশন ও লিগ্যাল এইডের ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী। আপসযোগ্য বা কম্পাউন্ডেবল মামলায় কোনো বন্দি কারাগারে থাকলে সংশ্লিষ্ট জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, বছরের পর বছর মামলা চলতে থাকলে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে এই ব্যয় ও বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ কমানো সম্ভব। আগামী এক বছরের মধ্যে যেসব জেলায় মামলা কমানো এবং নিষ্পত্তির হার বাড়াতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসবে, সেসব জেলার সংশ্লিষ্টদের উৎসাহিত বা পুরস্কৃত করার বিষয়েও আইন মন্ত্রণালয় পরিকল্পনা করছে।
অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা, অতিরিক্ত সচিব মো. খাদেম উল কায়েস, অতিরিক্ত সচিব এসএম এরশাদুল আলম এবং বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনজুরুল হোসাইনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ভার্চুয়ালি নতুন করে ই-বেইল বন্ডের আওতায় আসা ১২ জেলার বিচারক, আইনজীবী নেতৃবৃন্দ, জিপি-পিপি, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন ও কারা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন।
ই-বেইল বন্ডের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৪টি জেলায় ডিজিটাল জামিন কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এর ফলে জামিন সংক্রান্ত কার্যক্রমে সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমবে এবং বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়বে।











