অনলাইন ডেস্ক :
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়েছিলেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কেন খেলেনি, তা অনুসন্ধানে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির ২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। কমিটি বলেছে, এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনো একক ব্যক্তির সিদ্ধান্তে নেওয়া উচিত হয়নি। বাংলাদেশের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া উচিত ছিল বলেও মত দিয়েছে তারা।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গঠিত কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন অতিরিক্ত সচিব ড. এ কে এম ওলি উল্লাহ। সদস্য ছিলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর।
তদন্ত কমিটির সদস্য ফয়সাল দস্তগীর বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে না পাঠানোর পেছনে তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং সে সময়ের সরকার দায়ী।
তিনি বলেন, “এখানে ওয়ান পারসন বলতে তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকেই বোঝানো হয়েছে।” তার ভাষ্য, সব সংকট মোকাবিলা করে বাংলাদেশের বিশ্বকাপে যাওয়া উচিত ছিল।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের গ্রুপ পর্বের চারটি ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল ভারতে। এর মধ্যে তিনটি কলকাতায় এবং একটি মুম্বাইয়ে। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের কাছে ম্যাচগুলোর ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ করেছিল। আইসিসি সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে বাংলাদেশ দলকে ভারতে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিসিবিও সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি কোনো সম্মিলিত আলোচনা বা পরামর্শের ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নেওয়ার পরিবর্তে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ক্রিকেটারদের সঙ্গে বৈঠকেও তাদের মতামত নেওয়ার বদলে সিদ্ধান্তটি জানিয়ে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিটি বলেছে, “এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনো একক ব্যক্তির ইচ্ছায় নেওয়া উচিত নয়।” তাদের মতে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা, ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ এবং দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রত্যাশা বিবেচনায় নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
তদন্তে ক্রিকেটার, বিসিবি কর্মকর্তা, কোচ, ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও ক্রীড়া সাংবাদিকদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ছিলেন টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন কুমার দাস, টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবাল, প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরি, কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীনসহ সংশ্লিষ্ট অনেকে।
তবে যাদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদনে অভিযোগের বিষয়টি এসেছে, সেই সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও তৎকালীন বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটি। তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়নি।
বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আসিফ নজরুলের বক্তব্যের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২২ জানুয়ারি তিনি বলেছিলেন, নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় সরকারই বাংলাদেশ দলকে ভারতে পাঠাচ্ছে না। কিন্তু ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রীয় মাঠ উন্নয়নে বিসিবির অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রিকেটাররা।
সেদিন আসিফ নজরুল বলেছিলেন, “এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা ও ক্রিকেট বোর্ড। তারা দেশের ক্রিকেট, ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের মর্যাদার প্রশ্নে আত্মত্যাগ করেছে।”
তদন্ত কমিটি মনে করছে, বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য ভুল ছিল। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, ক্রিকেট বোর্ড, ক্রিকেটার এবং অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো থাকা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা বা ভেন্যু নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে সম্ভাব্য সমাধানের পথ খুঁজতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছে কমিটি।
ক্রিকেটারদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। প্রশাসনিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রিকেটাররা যেন বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে তদন্ত কমিটি।
তদন্ত কমিটির প্রধান ওলি উল্লাহ বলেন, “কে দোষী আমরা তা বলার জন্য বসিনি। এটা সরকারি সিদ্ধান্ত ছিল, দোষ কার আপনারা বুঝে নেন।”
এদিকে প্রতিবেদনে আইপিএলকে ঘিরে পেসার মোস্তাফিজুর রহমানের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথাও এসেছে। ওই পরিস্থিতির পর ক্রীড়া উপদেষ্টার নির্দেশে বিসিবি আইসিসির কাছে ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার চিঠি দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আইসিসি সূচি পরিবর্তনে রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ দলকে বিশ্বকাপে পাঠানো হয়নি এবং বাংলাদেশের পরিবর্তে স্কটল্যান্ডকে নেওয়া হয়।
তদন্ত কমিটির মতে, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া বা না নেওয়ার মতো সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থও বিবেচনা করা জরুরি। ভবিষ্যতে এমন সিদ্ধান্ত আরও স্বচ্ছ, সমন্বিত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।










