নিজস্ব প্রতিবেদক:
ইলেকট্রনিক বা ই-বর্জ্যরে রাসায়নিকে তীব্র হচ্ছে দেশের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি। কারণ ই-বর্জ্যরে সরঞ্জামের মধ্যে থাকে সিসা, সিলিকন, টিন, ক্যাডমিয়াম, পারদ, দস্তা, ক্রোমিয়াম, নাইট্রাস অক্সাইড প্রভৃতি রাসায়নিক। ওসব রাসায়নিক দূষিত করছে দেশের মাটি ও পানি। ফলে নানাভাবে তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে নানা রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বর্তমানে দেশে উদ্বেগজনক হারে ইলেকট্রনিক ই-বর্জ্যরে পরিমাণ বাড়ছে। কারণ দেশে প্রতিদিনই লাখ লাখ মুঠোফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, এয়ারকন্ডিশনারসহ নানা ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম অকেজো হচ্ছে। কিন্তু দেশে ওসব ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা নেই। ফলে অন্যান্য গৃহস্থালি ময়লা-আবর্জনার সঙ্গে ওসব বর্জ্যও ডাস্টবিনে ফেলা। বর্তমানে সোলার ও ব্যটারির বর্জ্যও এর সাথে যোগ হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের ই-বর্জ্যরে প্রায় ৯৭ শতাংশই বর্তমানে অনানুষ্ঠানিক খাতে প্রক্রিয়াজাত হয়। পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা, শহরতলির স্ক্র্যাপ মার্কেট কিংবা অস্থায়ী কারখানায় খোলা জায়গায় পুড়িয়ে, এসিড ব্যবহার করে বা হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে মূল্যবান ধাতু আলাদা করা হয়। ফলে সরাসরি বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসছে শ্রমিকরা। দেশে প্রতি বছর ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে ই-বর্জ্য। আগামী ২০৩৫ সাল নাগাদ বছরে ৪৬ লাখ টনে দাঁড়াবে ই-বর্জ্যরে পরিমাণ। ই-বর্জ্য গর্ভবতী নারী এবং নবজাতক শিশুর জন্য গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকির সৃষ্টি করে। তাছাড় ই-বর্জ্যরে প্রভাবে মানুষের বিভিন্ন টিস্যু, অঙ্গ ও সিস্টেম বিষাক্ত করে তুলে। তাতে শ্বাসযন্ত্র, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, স্নায়ু, মূত্রতন্ত্র ও প্রজনন ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত হয়। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন বা জাহাজভাঙা শিল্পের বর্জ্যরে পাশাপাশি সৌরবিদ্যুত্ খাত এখন নতুন করে ঝুঁকির তালিকায় যুক্ত হয়েছে। দেশে গত এক দশকে দ্রুত বেড়েছে সোলার হোম সিস্টেম, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুত্ এবং ব্যাটারিচালিত বিদ্যুত্ সংরক্ষণ ব্যবস্থার ব্যবহার। ওসব যন্ত্রের গড় আয়ুষ্কাল ১৫ থেকে ২৫ বছর। ফলে ধীরে ধীরে মেয়াদোত্তীর্ণ হতে শুরু করেছে বিপুল পরিমাণ সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি।
সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে স্থাপিত সোলার পিভি সেলগুলো থেকে অদূর ভবিষ্যতে উৎপন্ন হতে পারে প্রায় ৩৩ হাজার ২০৫ টন ই-বর্জ্য। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকলে ওই বর্জ্য থেকে ২৪ হাজার ৪৬৮ টন কাচ, ২ হাজার ৬৫৬ টন অ্যালুমিনিয়াম, ১ হাজার ৪০৪ টন সিলিকন এবং প্রায় ৫০ টন তামা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। কিন্তু দেশে কার্যকর রিসাইক্লিং ব্যবস্থা না থাকায় বর্জ্যে থাকা ভারী ধাতুগুলো বিপজ্জনক বিষে পরিণত হচ্ছে। তাছাড়া বর্তমানে বৈদ্যুতিক যানবাহন ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যবহার বাড়ায় দ্রুত বাড়ছে লিথিয়াম-আয়ন ও লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির বর্জ্যও। কিন্তু ওসব ব্যাটারি সংগ্রহ, পরিবহন ও পুনর্ব্যবহারে কোনো মানসম্মত নীতিমালার বাস্তবায়ন নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো ব্যাটারি খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হচ্ছে কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে গলানো হচ্ছে।
এদিকে এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার জানান, ই-বর্জ্য আলাদাভাবে ব্যবস্থাপনা হয় না। সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গেই তা ম্যানেজ করা হয়। তবে বর্তমানে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কোরিয়ান কোম্পানির সঙ্গে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন রিসোর্স রিকভারি সেন্টার তৈরির চুক্তি করেছে। প্রায় ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পে বর্জ্যকে সম্পদের রূপান্তরিত করতে এমআরএফ (ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি) প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্য পৃথক করা হবে। সেখানে প্লাস্টিক থেকে তেল, জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার এবং বায়োগ্যাস তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।











