গণপূর্তে জুবায়েরের ‘টেন্ডার রাজত্ব’: আয়ের সাথে সম্পদের আকাশ-পাতাল তফাত

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সরকারি চাকরির বেতনের সাপেক্ষে তার অর্জিত সম্পদের ব্যবধান আসমান-জমিন। রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, পূর্বাচলে বিঘার পর বিঘা প্লট, আর গ্রামের বাড়িতে শত শত শতাংশ স্থাবর সম্পত্তি। কথা হচ্ছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) কাঠের কারখানা সার্কেল-৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী জুবায়ের বিন হায়দারের অঢেল অবৈধ সম্পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে।

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত এক দশকে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কেনাকাটায় অনিয়ম ও ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন এই কর্মকর্তা।

 

একসময় পারিবারিক অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে দিন পার করলেও গণপূর্তে যোগ দেওয়ার পর অল্প সময়েই জুবায়ের বিন হায়দারের ভাগ্য বদলে যায়। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ৩৩/সি আসাদ এভিনিউ রোডে প্রায় ২,২০০ বর্গফুটের একটি অভিজাত ফ্ল্যাটের মালিক তিনি। বর্তমান বাজারে যার আনুমানিক মূল্য অন্তত ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে তার নামে ও বেনামে প্রায় ২০ কাঠা জমির সন্ধান পাওয়া গেছে। নিজ জেলা কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলায় নামে-বেনামে ক্রয় করেছেন বিপুল পরিমাণ স্থাবর জমি।

 

সরকারি বেতন কাঠামোর নিয়মিত আয়ের সাথে এসব বিপুল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের সামঞ্জস্য রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

 

গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, সার্কেল-৩-এর আওতাধীন অধিকাংশ ক্রয় ও মেরামত কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করতেন নির্বাহী প্রকৌশলী জুবায়ের।

 

অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে সিন্ডিকেট তৈরি করে তিনি সরকারি প্রকল্পের কাজ বন্টন করতেন। শুধু তাই নয়, প্রায় ১০ কোটি টাকার সরকারি বিলে ভুয়া মালামাল সরবরাহ, নিচু মানের যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং কাজের গুণগত মান বজায় না রেখে শতভাগ বিল পরিশোধের বড় ধরনের কারসাজি ধরা পড়েছে তার আমলেই।

 

একটি বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, কাঠের কারখানা সার্কেলের বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনাকাটা থেকে শুরু করে অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজে কাজের মান শিথিল করে ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন আদায় করা হতো।

 

বিগত সরকারের মেয়াদে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের সাথে ঘনিষ্ঠ সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন প্রকৌশলী জুবায়ের। এই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘ দিন গণপূর্তের গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে আধিপত্য বজায় রাখেন। কোনো কর্মকর্তা তার অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তাকে প্রশাসনিক হেনস্তার শিকার হতে হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।

 

এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, উত্থাপিত অভিযোগগুলোর মাত্রা অত্যন্ত গুরুতর। সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়মের প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে একটি উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

 

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, কোনো সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সাথে জীবনযাত্রার মান বা অর্জিত সম্পদের বৈষম্য দেখা দিলে তা মানিলন্ডারিং ও দুর্নীতি দমন আইনের আওতায় পড়ে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রাথমিক যাচাই শেষ করে দ্রুতই আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানে নামবে কমিশন।