গাজী নজরুলের জামিন নামঞ্জুর

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। বুধবার (৭ অক্টোবর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। একই মামলায় গাজী নজরুলের গাড়িচালক, মরিয়মের মামা ও শ্যালক হিসেবে উল্লেখিত ওবায়দুর রহমানের জামিনও নামঞ্জুর হয়েছে।

 

জামিন শুনানিতে গাজী নজরুল ইসলামকে আদালতে হাজির করা হয়নি। তিনি কারাগারে রয়েছেন। তাঁর পক্ষে আইনজীবী মাহবুবুর রহমান জামিনের আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে আইনজীবী হারুন অর রশিদ জামিনের বিরোধিতা করেন।

 

শুনানিতে আসামিপক্ষ থেকে গাজী নজরুলের বয়স, অসুস্থতা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের বিষয় তুলে ধরা হয়। জামিনের পক্ষে বাদীপক্ষের দেওয়া একটি আপসনামার কথাও আদালতে তুলে ধরা হয়। এতে মরিয়মের বাবা ও মামলার বাদী এস এম মাসুম বিল্লাহ জানান, গাজী নজরুলের জামিনে তাঁর আপত্তি নেই।

 

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, মামলায় দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে, যা অনাপসযোগ্য। তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। এটি আত্মহত্যা নাকি হত্যার ঘটনা, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় আপসনামার ভিত্তিতে জামিন দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি দেয়।

 

উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত জামিন নামঞ্জুরের আদেশ দেন। আদালত বলেন, আসামি বয়স্ক এবং ভুক্তভোগী অতি অল্প বয়সী। আসামির হেফাজতে থাকা অবস্থায় ভুক্তভোগী আত্মহত্যা করেছেন। এ অবস্থায় আসামিকে জামিন দেওয়া হলে সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।

আদালত আরও বলেন, এ ধরনের অনাপসযোগ্য মামলায় শুধু আপসনামার ভিত্তিতে জামিন দেওয়া হলে ন্যায়বিচার নিয়ে সমাজে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে।

 

এর আগে মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহর পক্ষ থেকে আদালতে দাখিল করা আপসনামায় বলা হয়, মামলা করার পর বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, তাঁর মেয়ের আত্মহত্যার পেছনে গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের প্ররোচনা বা তাঁদের কোনো রাগ-অভিমানের ভূমিকা ছিল না। দুই পক্ষ নিকটাত্মীয় হওয়ায় আলোচনা করে শান্তি বজায় রাখার জন্য তারা আপসনামায় স্বাক্ষর করেছেন বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।

 

আপসনামায় আরও বলা হয়, গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকসুদা ইসলাম জামিনে মুক্তি পেলে বাদীপক্ষের কোনো আপত্তি থাকবে না। তাঁরা মুক্তি পেলে দুই পক্ষের মধ্যে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করা হবে এবং বিচারাধীন বিষয়েও উভয় পক্ষ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।

 

এর আগে একই আপসের ভিত্তিতে মামলায় গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম জামিন পেয়েছেন। তবে গাজী নজরুলের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা হয়।

 

ঘটনার সূত্রপাত ২০ সেপ্টেম্বর। ওই দিন সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন জাতীয় সংসদ ভবনের উল্টো দিকে ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একটি প্রতিবেদনে মরিয়মের বয়স ১৯ বছর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ ওই রাতেই শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা, শ্যালক ও গাজী নজরুলের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

 

মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত জুনে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তাঁরা ন্যাম ভবনের ওই বাসায় গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকসুদার সঙ্গে বসবাস করতেন। বাদীর অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। মরিয়ম বিষয়গুলো বিভিন্ন সময়ে মুঠোফোনে পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

 

২০ সেপ্টেম্বর বিকেলে গাজী নজরুল মরিয়মের বাবাকে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। পরে সেখানে গিয়ে তিনি মরিয়মকে একটি কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। পুলিশের সহায়তায় দরজা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় বিছানার ওপর একটি সুইসাইড নোট পাওয়ার কথাও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

মামলা হওয়ার পর গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। ২১ সেপ্টেম্বর গাজী নজরুলের চার দিনের এবং মাকসুদার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিমান্ড শেষে ২২ সেপ্টেম্বর মাকসুদাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর ওবায়দুর রহমানকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। আর গাজী নজরুলের চার দিনের রিমান্ড শেষে ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁকে আবারও চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। পরে ৩০ সেপ্টেম্বর মাকসুদা ইসলাম জামিন পান।

 

এদিকে মরিয়মের মৃত্যুর আগে থেকেই গাজী নজরুলকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। গত জুলাইয়ে মরিয়মের সঙ্গে তাঁর কথিত ব্যক্তিগত মুহূর্তের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

 

ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনার পর অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ এবং ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে মারধর ও শ্বাসরোধ করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ২১ জুলাই পল্লবী থানায় একটি মামলা করেন ওবায়দুর রহমান। ওই মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম হাইকোর্ট থেকে ১০ আগস্ট আট সপ্তাহের জামিন পান।

 

এরপর ২২ জুলাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাংগঠনিক তদন্তে তাঁর নৈতিক স্খলনের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকেও জানানো হয়।

মরিয়মের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গাজী নজরুল বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। বুধবারের শুনানিতে আদালত তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করায় এ মামলায় তাঁর কারামুক্তির আবেদনও মঞ্জুর হয়নি।