ছেলে হত্যা মামলায় সাক্ষীর জবানবন্দি দিলেন আবু সাঈদের বাবা

অনলাইন ডেস্ক:

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় সাক্ষীর জবানবন্দি দিয়েছেন তার বাবা মকবুল হোসেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ তিনি জবানবন্দি প্রদান করেন। মকবুল হোসেন বলেন, সেদিন প্রথমে শুনি আবু সাঈদের গুলি লেগেছে, পরে শুনি— আমার আবু সাঈদ মারা গেছে। এই খবর শুনে আমার মাথায় আসমান ভেঙে পড়ে। আমি শহীদ আবু সাঈদের পিতা। আমার ছেলে আবু সাঈদ মেধাবী ছাত্র ছিল। সে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল এবং এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছিল। সে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ছিল। আবু সাঈদ টিউশনি করে নিজের খরচ চালাত বলে জানান তিনি। মকবুল হোসেন আরও বলেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আমি মাঠ থেকে কাজ করে বাড়িতে এসে দেখি, সবাই কান্নাকাটি করছে। প্রথমে শুনি, আবু সাঈদের গুলি লেগেছে। পরে শুনি, আমার আবু সাঈদ মারা গেছে। এই খবর শুনে আমার মাথায় আসমান ভেঙে পড়ে। জবানবন্দির এ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালে কান্নায় ভেঙে পড়েন আবু সাঈদের বাবা। মকবুল হোসেন বলেন, রাত সাড়ে ৩টার দিকে আবু সাঈদের লাশ বাড়িতে আসে। প্রশাসন বলে, রাতেই লাস দাফন করতে হবে। আমি বলি, রাতে দাফন সম্ভব না। পরদিন সকালে দুইবার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে আবু সাঈদকে দাফন করা হয়। আবু সাঈদকে গোসল করানোর সময় দেখি— তার মাথার পেছন থেকে রক্ত ঝরছিল, আর রক্তে ভাসা বুক গুলিতে ঝাঝরা ছিল। পরে শুনতে পাই—আমির ও সুজন চন্দ্র আমার ছেলেকে গুলি করে। এর কয়েকদিন আগে ছাত্রলীগ নেতা পোমেল বড়ুয়া আবু সাঈদের গলা চেপে ধরে তাকে থাপ্পড় মেরেছিল। আবু সাঈদকে যারা নির্মমভাবে শহীদ করেছে, ট্র্যাইব্যুনালের কাছে তার কঠোর বিচার চেয়ে মকবুল হোসেন জবানবন্দিতে বলেন, আমি মানুষের কাছে বলতাম, জীবিত থাকতে যেন ছেলের চাকরি করা দেখে যেতে পারি।

এখন আমি চাই, আমি জীবিত থাকতে যেন আমার ছেলের হত্যার বিচার দেখে যেতে পারি। এর আগে, আবু সাঈদ হত্যা মামলায় গত ২৪ জুন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত সংস্থা। এ ঘটনায় মোট ৩০ জনকে আসামি করা হয়। পরে গত ৩০ জুন মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। গত ১৩ জুলাই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য মামলায় গ্রেপ্তার রাসেল ও পারভেজকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে পলাতক ২৪ জনকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে আদালতে হাজির করতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। গত ২২ জুলাই এ মামলায় বেরোবির সাবেক ভিসি, রংপুর মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনারসহ পলাতক ২৪ আসামির পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। পরে প্রসিকিউটর প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেছিলেন, এ মামলায় ৩০ আসামির মধ্যে এখনও ২৪ জন পলাতক। তাদের বিরুদ্ধে দুটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তবে আদালতে হাজির না হওয়ায় পলাতক হিসেবেই এসব আসামির বিচারকাজ চলবে। আর গ্রেপ্তার ছয়জনের দুজন এখনও আইনজীবী নিয়োগ দেননি। তাদের ব্যাপারে ট্রাইব্যুনাল জানতে চেয়েছেন। এছাড়া পলাতক ২৪ জনের পক্ষে সরকারি খরচে চারজন স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

অর্থাৎ ছয়জনের জন্য একজন করে আইনজীবী লড়বেন। গত বছরের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন নির্মূলে আওয়ামী লীগ সরকার, তার দলীয় ক্যাডার ও সরকারের অনুগত প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত করে বলে, একের পর এক অভিযোগ জমা পড়ে।