দিল্লিতে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার আসাদ আলম সিয়াম, সম্মতি ভারতের

নিজস্ব প্রতিবেদক:

নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের নিয়োগে আনুষ্ঠানিক সম্মতি দিয়েছে ভারত। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সম্মতির বিষয়টি ঢাকাকে জানিয়েছে। একই দিন বিকেলে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সিয়ামের নিয়োগের আনুষ্ঠানিক সম্মতিপত্র বা অ্যাগ্রিমোঁর একটি অনুলিপি হস্তান্তর করা হয়েছে।

 

ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর আগে গত ১৩ জুলাই নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে আসাদ আলম সিয়ামের নাম ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব করেছিল বাংলাদেশ। সেই প্রস্তাবেই এখন আনুষ্ঠানিক সম্মতি দিয়েছে ভারত।

 

আসাদ আলম সিয়াম নয়াদিল্লিতে বর্তমান হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হবেন। রিয়াজ হামিদুল্লাহকে ইতিমধ্যে জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সিয়ামের নয়াদিল্লির দায়িত্ব নেওয়ার কথা রয়েছে।

 

সিয়ামের নিয়োগে ভারতের সম্মতি আসার আগে বিষয়টি নিয়ে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছিল। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টে তাঁর নিয়োগের আনুষ্ঠানিক সম্মতি দিতে দেরি হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। পরে ভারতের সম্মতি পাওয়ায় এ নিয়ে চলা জল্পনার অবসান হয়েছে।

 

১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেওয়া আসাদ আলম সিয়াম একজন পেশাদার কূটনীতিক। তিনি বিসিএস ১৫ ব্যাচের কর্মকর্তা। দীর্ঘ কূটনৈতিক জীবনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

 

আসাদ আলম সিয়াম বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে নেদারল্যান্ডসের মাস্ট্রিচট স্কুল অব ম্যানেজমেন্ট থেকে এমবিএ করেন। কাঠমান্ডুর সার্ক সচিবালয়, হাওয়াইয়ের এপিসিএসএস, সিউলের আইএফএএনএস এবং ঢাকার জাতীয় প্রতিরক্ষা কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বেশ কয়েকটি পেশাদার কোর্সও সম্পন্ন করেছেন।

 

বিদেশে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ইতালির মিলানে বাংলাদেশের প্রথম কনসাল জেনারেল ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপাইন, পালাউ, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, স্লোভেনিয়া ও স্লোভাকিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে সহকারী হাইকমিশনার এবং ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডে জুনিয়র কূটনীতিক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন আসাদ আলম সিয়াম। তিনি মন্ত্রণালয়ের প্রটোকল প্রধান, ইউরোপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এবং পররাষ্ট্রসচিবের দপ্তরের পরিচালক ছিলেন। ঢাকায় ফরেন সার্ভিস একাডেমির রেক্টরের দায়িত্বও পালন করেছেন।

 

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। অসংখ্য দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ভিয়েনায় জাতিসংঘের কার্যালয় এবং ওপেক তহবিলে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। ব্যাংককে ইউএন এসক্যাপে বাংলাদেশের বিকল্প স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

২০২৫ সালের জুনে পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে নিয়োগ পান আসাদ আলম সিয়াম। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে এ পদে নিয়োগ দেয়। পররাষ্ট্রসচিব হওয়ার আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অস্ট্রিয়ায় এবং ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ফিলিপিন্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন।

 

নয়াদিল্লিতে সিয়ামের নিয়োগ এমন এক সময়ে চূড়ান্ত হলো, যখন বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ চলছে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়।

 

পরবর্তীতে চলতি বছরের শুরুর দিকে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়। তবে ভারতে শেখ হাসিনার উপস্থিতি ঢাকার জন্য অন্যতম কূটনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে দ্বিপক্ষীয় অগ্রগতিও কিছুটা মন্থর ছিল।

 

এই প্রেক্ষাপটে দিল্লি মিশনের জন্য প্রশাসনের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ কূটনীতিককে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। এর আগে ভারত সাবেক মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় নতুন হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এর পরই নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে আসাদ আলম সিয়ামকে পাঠানোর সিদ্ধান্তের কথা সামনে আসে।

 

সিয়ামের নতুন দায়িত্বের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের বিষয়টিও যুক্ত হচ্ছে। দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার পাশাপাশি সম্ভাব্য ওই সফরের কূটনৈতিক প্রস্তুতিতেও তাঁকে ভূমিকা রাখতে হবে।

 

দ্বিপক্ষীয় সফরের পাশাপাশি বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। তবে বাংলাদেশ ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেয়নি। একই সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের বিষয়টিও এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

 

এমন পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে আসাদ আলম সিয়ামের দায়িত্ব হবে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় কাজ করা। তাঁর দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতাই নতুন দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।