দেশে কর্মসংস্থান বাড়ার বদলে কমছে

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশে কর্মসংস্থান বাড়ার বদলে কমছে। যদিও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বৈষম্য দূর করাই ছিলো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে বিপরীত। বর্তমানে নানা সঙ্কটে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে অনেককেই চাকরি হারাতে হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি নিয়োগেও বিরাজ করছে দীর্ঘসূত্রতা। অথচ প্রতি বছরই বাড়ছে বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান প্রত্যাশী শিক্ষিত তরুণের সংখ্যা। অথচ চাকরির বাজার সম্প্রসারিত না হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। সরকারি হিসাবে দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ আর ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ হচ্ছে বেকারত্বের হার। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হচ্ছে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব। বর্তমানে দেশে বিশ্ববিদ্যালয় বা সমমানের গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। প্রতি বছর দেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে গড়ে প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক সম্পন্ন করলেও মাত্র ৩ লাখের মতো আনুষ্ঠানিক চাকরি তৈরি হয়। ফলে প্রতি বছরই দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের ঝুঁকিতে পড়ছে প্রায় ৪ লাখ নতুন গ্র্যাজুয়েট। শিল্পোদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদদের সূত্র এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে বিনিয়োগ ও শিল্পোৎপাদনের সাথে কর্মসংস্থানের সঙ্গে সবচেয়ে গভীর সম্পর্ক। নতুন শিল্প না হলে নতুন চাকরি সৃষ্টি হয় না। কিন্তু বর্তমানে দেশে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন নেমে এসেছে। মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। পাশাপাশি গ্যাসসংকট, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন ব্যয়ের কারণেও বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের শিল্পাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে শুধুমাত্র বিজিএমইএর সদস্য অন্তত ৮০টি কারখানাতেই ১৯ হাজার ১৮৮ শ্রমিক চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাই হয়েছে। তার মধ্যে ২৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিগত ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ৭টি প্রধান শিল্পাঞ্চলে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে ৪৫৭টি শিল্প ইউনিট। তার মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য কারখানা ১০৮টি, বিকেএমইএর ৩৫টি, বিটিএমএর ৮টি এবং বেপজা-সংশ্লিষ্ট ১৯টি। মূলত রপ্তানিমুখী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিষ্ঠানই বন্ধের তালিকায় রয়েছে। আর বন্ধ হওয়া বাকি ২৮৭টি ছিল পোশাকবহির্ভূত শিল্প।

 

সূত্র জানায়, এখনো দেশে বিনিয়োগ আশানুরূপ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। পাশাপাশি বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অনেক শিল্প-কারখানার চাকরিও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। বিনিয়োগ ও শিল্পের গতি না বাড়লে আরো বাড়বে বেকারত্ব। দেশে টেকসই কর্মসংস্থান তৈরির জন্য শিল্পে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। কিন্তু সামপ্রতিক সময়ে দেশে জ্বালানি সঙ্কট প্রকট হয়ে উঠেছে। তাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির মতো অনুকূল পরিবেশ গড়ে তো উঠছেই না, বরং অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। তাছাড়া সরকারি চাকরিতেও আশানুরূপ কর্মসংস্থান হচ্ছে না। বর্তমানে সরকারি দপ্তরগুলোতে অনুমোদিত ১৯ লাখ ৮৬ হাজার পদের বিপরীতে ১৪ লাখ ৬৪ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছে। আর প্রায় ৫ লাখ ২২ হাজার পদই শূন্য রয়েছে। আর ওসব পদে নিয়োগের আশায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করছে লাখো চাকরিপ্রার্থী। কিন্তু বিসিএস, ব্যাংক ও অন্যান্য নিয়োগ পরীক্ষায় প্রিলিমিনারি থেকে চূড়ান্ত সুপারিশ পর্যন্ত গড়ে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থাকার পেছনে মূলত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি প্রধান কারণ।

 

সূত্র আরো জানায়, প্রতি বছর দেশের শ্রমবাজারে ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ নতুন করে প্রবেশ করেন। আর তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিদেশে কাজের সুযোগ পায়। বাকি ১৪-১৫ লাখের জন্য দেশে তৈরি করতে হয় নতুন কর্মসংস্থান। কিন্তু বাস্তবে নতুন শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের গতি ওই চাহিদা অনুযায়ী বাড়ছে। তাতে প্রতি বছর আগের বছরের বেকারের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন চাকরিপ্রার্থীরা। ফলে চাকরির বাজারে ক্রমেই তীব্র হচ্ছে প্রতিযোগিতা। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী বিগত ২০২৫ সালে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। আর চলতি ২০২৬ সালে আগে ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার আশা থাকলেও তা এখন মাত্র ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। একই সঙ্গে প্রায় ৬ লাখ চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। মূলত কর্মসংস্থান সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি একে অন্যকে আরো তীব্র করছে। তবে বর্তমানে দেশে কর্মসংস্থানের সংকটে বিদেশি শ্রমবাজারই বড় আশ্রয়। গত ছয় মাসে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৩৫০ কর্মী বিদেশে গেছে। বাংলাদেশ ১৪০ দেশে কর্মী পাঠালেও বাস্তবে ১০ থেকে ১২ দেশের ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। মোট জনশক্তি রপ্তানির প্রায় ৭৫ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। কিন্তু যুদ্ধের কারণে ওই বাজারে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। যদিও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে পারলে দেশে বেকারত্বের চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশের জন্য কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াও দ্রুত করা প্রয়োজন।

 

এদিকে বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাত, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং যুদ্ধের প্রভাবও দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতে পড়েছে। ফলে গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর হার। দেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে গত ৬ মাসে কর্মী রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অর্ধেকের বেশি কমেছে। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বাকি শ্রমবাজারগুলোর পরিস্থিতিও একই। ফলে বৈদেশিক আয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ছে। আর এ ধারা অব্যাহত থাকলে থাকলে রেমিট্যান্স প্রবাহে লাগতে পারে বড় ধাক্কা। গত ৬ মাসে বিদেশে কর্মী রপ্তানি বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৫ লাখ ৭৯ হাজার ৫৭৯ জন কর্মী বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গেলেও চলতি বছরে ওই সংখ্যা এ ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৯৫৪ জনে সে দাঁড়িয়েছে। কর্মী রপ্তানির ধস সামাল দিতে বাংলাদেশকে এখন মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক একক বাজারকেন্দ্রিক নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ ও আফ্রিকার উদীয়মান বাজারগুলোতে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করা জরুরি।

 

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে শিল্প খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, বন্ধ ও রুগ্ন কারখানা পুনরায় চালু করা, উৎপাদন সমপ্রসারণ এবং শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি জরুরি। পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। তাছাড়া সরকারি ৫ লাখের বেশি শূন্যপদও দ্রুত, স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি বাড়ানোর ওপর নজর দিতে হবে। আর বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে নতুন শ্রমবাজার সমপ্রসারণ, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, কর্মীদের ভাষা ও যোগাযোগদক্ষতা উন্নয়ন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর সময় কমানো এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের জোরদার সমন্বয় প্রয়োজন।

 

এ প্রসঙ্গে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানান, কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিনিয়োগকে বাস্তব কারখানা ও উৎপাদনে রূপ দেয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় বিনিয়োগ পরিবেশের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে ২৫টি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল এবং ইতোমধ্যে ১০ হাজার একরের বেশি শিল্পভূমিতে ৪৪টি বিনিয়োগের সুযোগ চিহ্নিত করা হয়েছে। বন্ধ ও অব্যবহৃত সরকারি শিল্পসম্পদকে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে ফিরিয়ে আনাও এ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য। আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ১ লাখের বেশি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে বাস্তবায়নের গতি এখনো সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হলেও মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর হতে দেরি হচ্ছে। আর একটি কারখানা চালু করতে বিনিয়োগকারীদের একাধিক সংস্থার অনুমোদন নিতে হয়। সেজন্য সিঙ্গেল উইন্ডোব্যবস্থার মাধ্যমে ১৪ দিনের মধ্যে ব্যবসায়িক অনুমোদনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর আগামী পর্যায়ের মূল লক্ষ্য হবে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব প্রকল্প, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে রূপ দেয়া।

 

বিদেশে কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর জানান, নতুন শ্রমবাজার খোঁজা এবং বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার সুযোগ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া সফর করেছেন। তারপর গত জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও মন্ত্রীও দেশটি সফর করেন। ফলে শিগগিরই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর পথ আরো সহজ হবে বলে আশা করছে সরকার।