দেশে গ্যাস সঙ্কট তীব্র হলেও ধীরগতিতে চলছে কূপ খনন

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশে গ্যাস সঙ্কট তীব্র হলেও ধীরগতিতে চলছে কূপ খনন। গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ২ বছরে ১শ’টি কূপ খননের উদ্যোগ নিলেও বিগত ৬ মাসে মাত্র ৩টি কূপের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) ওই কূপগুলো খনন করবে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত ১শ’ কূপ খনন এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ চলতি অর্থবছরের প্রথম এবং বর্তমান সরকারের ষষ্ঠ একনেক সভায় বাপেক্সের প্রস্তাব করা মাত্র ৩টি কূপ খননের একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া দেয়া হয়েছে। আর ওই কূপগুলো হচ্ছে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ-৫ ও বেগমগঞ্জ-৬ এবং সুনামগঞ্জের সুনেত্র-২। অথচ ২০২৮ সালের মধ্যে দেশে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে সরকার ১০০ কূপ খননের উদ্যোগ নেয়। ফলে ২ বছরেরও কম সময়ে বাকি ৯৭টি কূপ খনন করা বাস্তবে কতটা সম্ভব তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইতিপূর্বে নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন করা যায়নি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নেয়া ৫০টি কূপ খননের প্রকল্পও। পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকারের নেয়া ১শ’ কূপ খননে আগের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সংশোধিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১ সালের মধ্যে মোট ১২০টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি কোনো পরিকল্পনা বা প্রকল্প। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এখন পর্যন্ত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) ৭টি সভায় মোট ৫৯টি প্রকল্প অনুমোদন হলেও স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে কেবল একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। আর বাপেক্সের প্রস্তাব করা ওই ৩টি কূপ খননে প্রায় ৭২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়।

 

সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে বিগত ২০২২ সালে ৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলো। ওসব কূপ খননের মাধ্যমে লক্ষ্য নির্ধারণ হয়েছিল ২০২৫ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফ) গ্যাস যুক্ত করার। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটির সব কূপ খনন করা সম্ভব হয়নি। ফলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী জাতীয় গ্যাস গ্রিডেও গ্যাস যুক্ত করা যায়নি। তবে ওই ৫০ কূপের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩০টি খনন করা হয়েছে। আর বাকি ২০টি কূপকে যুক্ত করা হচ্ছে বর্তমান সরকারের নতুন পরিকল্পনার সঙ্গে। মূলত কূপ খননে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পর্যাপ্ত রিগের প্রয়োজন। কিন্তু তা বাপেক্সের নেই। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অর্থ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও কূপ খনন ধীর হয়ে পড়ার বড় কারণ। তাছাড়া বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক ইস্যুসহ নানা কারণেও যথাসময়ে কূপ খনন করা যায়নি। এখন ১২০টি কূপ খননের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তার আগের ২০টি এবং নতুন আরো ১শ’টি কূপ। আগামী ২০৩১ সালের মধ্যে ওসব কূপ খনন করা হবে। তকে বিপুলসংখ্যক কূপ খননে প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থ ও প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রসহ নানা ধরনের অনুমোদন। আগামী ২০৩১ সাল নাগাদ ওসব কূপ খনন করতে হলে প্রতি বছর ৩০টি করে কূপ খনন করতে হবে। সেক্ষেত্রে পেট্রোবাংলা দেশীয় রিগ এবং বিদেশী কোম্পানির ভাড়া রিগ এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে কাজ দিয়ে কূপ খনন করতে চাচ্ছে।

 

সূত্র আরো জানায়, ১শ’ কূপ খননের পরিকল্পনাটি বিগত সময়ের ছিলো। বর্তমান সরকার ওই পরিকল্পনা নতুন করে সাজিয়েছে। ১শ’টি কূপ খননের উদ্যোগের মধ্যে ৬৯টিই অনুসন্ধান কূপ আর বাকি ৩১টি বিদ্যমান কূপের ওয়ার্কওভার। তার মধ্যে বাপেক্স চেয়েছিলো ৬৮টি কূপ খনন করতে। ওই পরিকল্পনায় ২০২৮ সাল নাগাদ জাতীয় গ্রিডে দৈনিক আরো ১৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার লক্ষ্য ছিল। বাকি ৩২টি কূপ বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (বিজিএফসিএল) ও সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) খনন করার কথা ছিলো। ১শ’ কূপ খননে মোট ১৯ হাজার ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলনও করা হয়। তার মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১৩ হাজার ৩২৮ কোটি এবং গ্যাস উন্নয়ন তহবিল (জিডিএফ) ও কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়ন ৫ হাজার ৭২২ কোটি টাকা। তবে ওই পরিকল্পনার অর্থায়ন, কূপ খননের বার্ষিক পরিকল্পনা এবং সময়সীমা নতুন করে পুননির্ধারণ হয়েছে।

 

এদিকে দেশে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন ক্রমেই কমে যাওয়ায় ঘাটতি পূরণে কূপ খননের পাশাপাশি সরকার বাইরে থেকে আমদানি করছে এলএনজি। সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণেরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তাছাড়া সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানেও দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে সরকারের ওসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে সর্বপ্রথম অভ্যন্তরীণ গ্যাস খাতের উত্তোলনে জোরালো অনুসন্ধান ও কূপ খনন প্রকল্প আরো জোরদার করা জরুরি বলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।