নিজস্ব প্রতিবেদক:
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান অব্যাহত রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধ, অর্থাৎ জুলাই থেকে ডিসেম্বর মেয়াদের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে নীতি সুদহার বা পলিসি রেপো রেট ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান নতুন মুদ্রানীতির ঘোষণা দেন। মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। এটি বর্তমান বিএনপি সরকারের অধীনে গভর্নরের ঘোষিত প্রথম মুদ্রানীতি।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগে গতি ধরে রাখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই নতুন মুদ্রানীতির প্রধান লক্ষ্য। সরকারের ঘোষিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এ নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে।
বর্তমানে মূল্যস্ফীতি এখনও লক্ষ্যমাত্রার অনেক ওপরে রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। একই সময়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাময়িক হিসাবে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি, এসএলএফ ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি, এসডিএফ ৭ দশমিক ৫০ শতাংশেও কোনো পরিবর্তন আনেনি।
নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কমিয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের মুদ্রানীতিতে এ লক্ষ্য ছিল ৮ শতাংশের বেশি। তবে বাস্তবে মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে প্রায় ৫ শতাংশে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ।
ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান বলেন, “সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন প্রণোদনামূলক উদ্যোগের কারণে আগামী সময়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও জোরদার হবে বলে আমরা আশা করছি। অর্থবছর শেষে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। একই সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।”
গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানান, খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৮ মাসের কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা এখন আর পুনঃতফসিলীকরণ উৎসাহিত করছি না। আর্থিক সংকটে থাকা কিন্তু ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে, এমন ঋণগ্রহীতাদের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ রাখা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “ব্যাংকিং খাতে যেকোনো অনিয়মের ক্ষেত্রে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি অনুসরণ করা হবে। কোনো ধরনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতির ওপর বৈশ্বিক বিভিন্ন ঝুঁকির প্রভাব এখনও রয়ে গেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের চাপ এবং বৈদেশিক অনিশ্চয়তা মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। এসব বিবেচনায় কঠোর মুদ্রানীতির অবস্থান আপাতত বহাল রাখা হয়েছে।











