অনলাইন ডেস্ক:
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নতুন সরকার গঠনের প্রচেষ্টায় বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে দেশটির দুই আরব-অধ্যুষিত রাজনৈতিক দল। তবে তাদের সমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও আইজেনকটের সরকার গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে তার জোটেরই ডানপন্থী দল ইসরাইল বেইতেনু, যারা আরব দলগুলোর সমর্থননির্ভর কোনো সরকারে যোগ না দেওয়ার বিষয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে।
ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ জানিয়েছেন, আগামী রোববার নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে কার হাতে তুলে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবেন তিনি। মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বৈঠক শেষ করে বৃহস্পতিবার এই তথ্য জানান তিনি।
গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কিংবা সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকট—কেউই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ম্যাজিক ফিগার বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেননি। বিগত তিন বছর ধরে যুদ্ধরত ইসরাইলকে নেতৃত্ব দিয়ে আসা ডানপন্থী নেতা নেতানিয়াহুর বিপরীতে দেশটির জাতীয় ঐক্য ফিরিয়ে আনার জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আইজেনকট।
সংসদের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, পার্লামেন্টে সর্বাধিক সংখ্যক সদস্যের সমর্থন প্রাপ্ত নেতামুখকেই সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়ে থাকেন রাষ্ট্রপ্রধান। চলমান নির্বাচনে রেকর্ড ৬৭ জন পার্লামেন্ট সদস্য বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের পক্ষে তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন মাত্র ৪৬ জন আইনপ্রণেতা এবং বাকি সাতজন কোনো পক্ষেই সমর্থন জানাননি।
প্রেসিডেন্ট হারজগ জানিয়েছেন, চলমান রাজনৈতিক আলোচনার ফলাফল আপাতদৃষ্টিতে স্পষ্ট বলে মনে হলেও দেশের আইন অনুযায়ী কার প্রকৃতপক্ষে সরকার পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে তা নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা তার সাংবিধানিক দায়িত্ব। বিশেষ করে দুই প্রধান জোটের পারস্পরিক ভেটো এবং নিজেদের জোটের অভ্যন্তরে চলমান মতবিরোধের কারণে সার্বিক পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি কুয়াশামুক্ত নয়।
রাষ্ট্রপ্রধান আরও যোগ করেছেন যে, পরিস্থিতি দ্রুত ও সরাসরি সমাধানের লক্ষ্যে তিনি কিছু নির্দিষ্ট দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে খুব শীঘ্রই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া চালাবেন।
আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল ইয়াশার বৃহস্পতিবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে কড়া ভাষায় জানিয়েছে যে, ইসরাইলের সাধারণ নাগরিকেরা ক্ষমতার পরিবর্তন স্পষ্টভাবে বেছে নিয়েছেন এবং বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও তার মন্ত্রিসভার ওপর থেকে সম্পূর্ণ অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে দেশের সব নাগরিকের কল্যাণ নিশ্চিত করতে অবিলম্বে একটি জাতীয় জরুরি সরকার গঠনের দাবি তুলেছে দলটি।
আসন্ন নির্বাচনে আরব-অধ্যুষিত দুটি রাজনৈতিক দল অভাবনীয় ও ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে। দল দুটি যৌথভাবে মোট ১৯টি আসন নিজেদের ঝুলিতে পুরেছে। আইজেনকটের বিরোধী জোট যদি এই দলগুলোর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে সম্মত হয়, তবে নতুন সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় তারা অত্যন্ত নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত বা স্পষ্ট সিদ্ধান্ত আসেনি।
বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতে উভয় আরব দলই আনুষ্ঠানিকভাবে গাদি আইজেনকটের প্রতি নিজেদের সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
তবে জটিলতার মূল জায়গাটি হলো আইজেনকটের নিজের জোটের শরিক দল ডানপন্থী ইসরাইল বেইতেনু, যারা শুরু থেকেই আরব দলগুলোর সমর্থনপুষ্ট কোনো জোটে অংশ নেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করে আসছে।
এই দলটির প্রধান আভিগদর লিবারম্যান একসময়ে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও পরবর্তীতে তার কঠোর সমালোচকে রূপ নেন। আরব দলগুলো হামাসকে সরাসরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে—মূলত এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই আপত্তি তুলছেন তিনি, যদিও ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে চালানো হামাসের বিরুদ্ধে এই দলগুলো একাধিকবার নিন্দা জ্ঞাপন করেছে।
এদিকে, বিগত পাঁচটি নির্বাচনে নেতানিয়াহুর পক্ষে নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়ে আসা অতি-ধর্মপ্রাণ ইহুদিদের প্রভাবশালী দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট হারজগের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নেতানিয়াহুকে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী করার কোনো আনুষ্ঠানিক সুপারিশ করেনি, আবার আইজেনকটের পক্ষেও নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেনি।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, ১২০ আসনবিশিষ্ট পার্লামেন্টে ৭টি আসন জয় করা এই দলটি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে তারা সরকার গঠনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট পার্লামেন্ট সদস্যের নাম সুপারিশ করবে না।
আরেকটি অতি-ধর্মপ্রাণ ইহুদি দল শাসের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম বরাবরই ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে বিশেষ অব্যাহতি দেওয়ার দাবিটি জোরালোভাবে বজায় রেখে আসছে।
যদিও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এই অব্যাহতি প্রশাসনিকভাবে বজায় রেখেছিলেন, তবে তিনি কোনো নির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিষয়টিকে স্থায়ী রূপ দেননি। চলমান গাজা, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের কারণে ইসরাইলের অসংখ্য সংরক্ষিত সেনাকে বারবার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, যার ফলে সামরিক সেবা থেকে ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের এই বিশেষ ছাড় দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে।
ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের শীর্ষ আইনপ্রণেতা আইজ্যাক পিনড্রাস এই প্রসঙ্গে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, ভবিষ্যতে যে দল বা জোটেরই সরকার গঠিত হোক না কেন, তাদের মূল এবং তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হতে হবে তোরাহ শিক্ষার্থীদের সাংবিধানিক ও আইনি অবস্থান নিশ্চিত করা।
বিপরীতে, রাজনৈতিক বর্ণালীর বাম থেকে ডান—সর্বস্তরের ধর্মনিরপেক্ষ ইসরাইলি নাগরিকদের সমর্থন আদায়ে সচেষ্ট থাকা আইজেনকট সামরিক বাহিনীর বাধ্যতামূলক সেবা থেকে কাউকে বিশেষ ছাড় দেওয়ার বিপক্ষে কঠোর ও অনড় অবস্থানে রয়েছেন।
আইজেনকটের জোটের অন্তর্ভুক্ত বেশ কয়েকজন মিত্র নেতা অতি-ধর্মপ্রাণ ইহুদি সম্প্রদায়ের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছেন। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ এই সম্প্রদায়ের মানুষ হলেও ধর্মনিরপেক্ষ ইসরাইলিদের তুলনায় তাদের জন্মহার অনেক বেশি, যা রাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে অভিযোগ সমালোচকদের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের বর্তমান রহস্যময় অবস্থানের পেছনের মূল উদ্দেশ্য হলো নেতানিয়াহুকে কিছুটা শিক্ষা দেওয়া এবং অতিমাত্রায় নিশ্চিত ধরে নেওয়ার সুযোগ না দেওয়া। তবে শেষ পর্যন্ত যদি নেতানিয়াহু পুনরায় সরকার গঠন করতে সক্ষম হন, তবে এই দলটি শেষ পর্যন্ত জোটে যোগ দিতে পারে।
সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট হারজগ কোনো নির্দিষ্ট আইনপ্রণেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার পর তিনি সর্বোচ্চ ২৮ দিন সময় পাবেন। পরিস্থিতি সাপেক্ষে এই সময়সীমা আরও ১৪ দিন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। নির্ধারিত এই মেয়াদের মধ্যে সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য কোনো নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব অর্পণ করবেন।
নতুন গঠিত পার্লামেন্টে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমসহ নেতানিয়াহুর পুরো জোটের মোট আসনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩টিতে। অপরদিকে, বিরোধী দলগুলোর জোটভুক্ত গাদি আইজেনকটের ঝুলিতে রয়েছে ৪৮টি আসন।
নেতানিয়াহুর অতি-ডানপন্থী সরকারের আমলের নানা অনিয়ম, ক্ষোভ এবং সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর উগ্র বর্ণবাদী বক্তব্য ও আরব ইসরাইলিদের প্রতি দীর্ঘমেয়াদী বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে এবারের নির্বাচনে আরব-অধ্যুষিত দলগুলো তাদের ইতিহাসে অন্যতম বড় সাফল্য ঘরে তুলতে সমর্থ হয়েছে।
আরব আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর এই সম্ভাব্য রাজনৈতিক জোট গঠনের বিষয়টি নিয়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে একাধিকবার তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
গত বুধবার প্রকাশিত একটি ভিডিওবার্তায় নেতানিয়াহু গুরুতর অভিযোগ তোলেন যে, এবারের নির্বাচনে বিদেশি শক্তির গোপন অর্থায়নের বিষয়ে যথেষ্ট জোরালো সন্দেহ রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দেশের আরব নাগরিকদের রাষ্ট্র আনুগত্যের প্রশ্ন নিয়েও জনসমক্ষে সন্দেহ প্রকাশ করেন।











