নেতৃত্ব শূন্যতায় স্থবির জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম

নিজস্ব প্রতিবেদক:

স্থবির হয়ে রয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম। অথচ এখনো সেখানে প্রতি সপ্তাহে জমা পড়ছে ৮ থেকে ১০টি নতুন অভিযোগ। সেসব অভিযোগের শুধু সারাংশ তৈরি করে ফাইলবন্দি করে রাখা হচ্ছে। কিন্তু অভিযোগের তদন্ত, শুনানি ও প্রতিকার নিশ্চিত করার কার্যক্রম নেই। দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্তর মানবাধিকার সুরক্ষা। নাগরিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দায়েরের শেষ ভরসার জায়গা হচ্ছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। কিন্তু ৪ মাস ধরে নেতৃত্বশূন্য ওই কমিশন। আর পূর্ণাঙ্গ কমিশন না থাকায় নেয়া যাচ্ছে না অভিযোগের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১ হাজার ২৮৩টি অভিযোগ অনিষ্পন্ন ছিলো। তার মধ্যে ৭৪৫টি অভিযোগের ক্ষেত্রে এখনো নেয়া হয়নি কোনো ধরনের পদক্ষেপ। পাশাপাশি ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৬৯টি, চট্টগ্রাম ও সিলেটে ১৪৬টি, খুলনা ও বরিশালে ১১৭টি, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে ১১৩টি নতুন অভিযোগের বিষয়ে গ্রহণ করা যায়নি কোনো পদক্ষেপই। তার বাইরে গুম কমিশন থেকে পাওয়া প্রায় দেড় হাজার অভিযোগ ফেলে রাখা হয়েছে সিলগালা অবস্থায়। ওসব অভিযোগের বিষয়ে নেয়া যাচ্ছে না কোনো সিদ্ধান্ত।

 

সূত্র জানায়, দেশের নাগরিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকার দিতে ২০০৯ সালে আইন করে গঠন করা হয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। কিন্তু ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে মানবাধিকার আইন বাতিল করে নতুন অধ্যাদেশ জারি করে। আর ওই অধ্যাদেশের ভিত্তিতে চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত এক বিচারপতিকে চেয়ারম্যান করে ৫ সদস্যের নতুন কমিশন গঠন করে। কিন্তু বর্তমান সরকার ওই অধ্যাদেশটি বাতিল করে পুনর্বহাল করে ২০০৯ সালের আইন। তারপরই অধ্যাদেশের অধীনে নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যান ও সব সদস্য এপ্রিল মাসে পদত্যাগ করেন। আর তারপর থেকেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে রয়েছে। যদিও গত ১০ আগস্ট মন্ত্রিসভা ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬’-এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। তাতে তদন্ত চলাকালে ভুক্তভোগীর তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা ক্ষতি রোধে কমিশনকে অন্তর্বর্তী আদেশ দেয়ার ক্ষমতার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে কমিশনের নেতৃত্ব না থাকায় নতুন আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া চললেও নিষ্পত্তি হচ্ছে না বর্তমান অভিযোগগুলো। আর আইন প্রণয়ন ও কমিশন গঠনের দীর্ঘসূত্রতায় দীর্ঘ হচ্ছে ভুক্তভোগীদের প্রতিকার পাওয়ার অপেক্ষা।

 

সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে কোনো অভিযোগ জমা পড়লে তার সারাংশ নথিভুক্ত করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। যাতে নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের পর ওসব অভিযোগ উত্থাপন করা যায়। তখন কমিশনই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। কারণ মানবাধিকার কমিশনে একটি অভিযোগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন নাগরিকের অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা। কিন্তু ওই অভিযোগ বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে ভুক্তভোগীর প্রতিকারের পথও দীর্ঘায়িত হয়। সেজন্য কোনো মুহূর্তেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পদ শূন্য থাকা ঠিক নয়। বরং সব ধরনের জটিলতা দ্রুত নিরসন করে কমিশন গঠন এবং কমিশনকে কার্যকর ক্ষমতা প্রদান প্রয়োজন।

 

এদিকে মানবাধিকার কর্মীদের মতে, বর্তমানে দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো নিয়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে সরাসরি জবাব পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা কার্যত নেই। হারিয়ে গেছে এ বিষয়ের মেকানিজম। নাগরিকদের স্বার্থে কোনো মুহূর্তেই মানবাধিকার কমিশনের পদ খালি থাকা উচিত নয়। আর শুধু চেয়ারম্যান নিয়োগ দিলেই হবে না, কমিশনকে কার্যকর ক্ষমতা দিতে হবে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে কমিশন যাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে, সে ক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।

 

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে কমিশনের বর্তমান কার্যক্রম প্রসঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সচিব (জেলা ও দায়রা জজ) কুদরত-এ-ইলাহী জানান, প্রতি সপ্তাহেই ৮ থেকে ১০টি অভিযোগ আসছে। তবে চেয়ারম্যান বা সদস্য কেউ না থাকায় ২০০৯ সালের আইন অনুযায়ী অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করা যাচ্ছে না। বর্তমানে অভিযোগ এলে সারাংশ তৈরি করে নথিভুক্ত করে রাখা হচ্ছে। পরবর্তীতে চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ হলে তাদের কাছে উপস্থাপন করা হবে।