নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা, মৃত বেড়ে ৬৩৩, নিখোঁজ প্রায় ৩ হাজার

অনলাইন ডেস্ক:

নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৩৩ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপালে ৬২৬ জন এবং তিব্বতে অন্তত ৭ জন নিহত হয়েছেন। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) জানিয়েছে, দেশটিতে এখনো ২ হাজার ৪২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তিব্বতে নিখোঁজ ৫৫৮ জন।

 

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের এনডিআরআরএমএ-এর সর্বশেষ হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৬২৬ এবং নিখোঁজ ২ হাজার ৪২৬ জন। এর আগে নেপাল পুলিশের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৬১৬ জন বলা হয়েছিল। অর্থাৎ একই সময়ে দুই সরকারি সংস্থার হিসাবে কিছুটা পার্থক্য ছিল। তবে সর্বশেষ এনডিআরআরএমএ -এর তথ্য অনুযায়ী নেপালে মৃতের সংখ্যা ৬২৬।

 

তিব্বতে চীনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত সাতজনে পৌঁছেছে। সেখানে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক বলে আগের দেওয়া তথ্যে জানানো হয়েছিল।

 

বুধবারের ভয়াবহ দুর্যোগের পর চতুর্থ দিনেও নেপাল ও তিব্বতের দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান চলছে। ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও ভেঙে যাওয়া সড়ক এবং সেতুর কারণে দুর্গত এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই উদ্ধারকারীরা বিভিন্ন এলাকায় জীবিতদের সন্ধান করছেন।

 

বিবিসি জানায়, নেপালের চিতওয়ান জেলায় এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা ২৩৩টি মরদেহের মধ্যে মাত্র চারটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, উদ্ধার করা মরদেহ ও দেহাবশেষের অনেকগুলো পচন ধরে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে সেগুলো আর চেনা যাচ্ছে না। শনাক্তের জন্য ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। বাকি ২২৯টি মরদেহ বিভিন্ন সংরক্ষণকেন্দ্র ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রাখা হয়েছে।

 

দুর্যোগের পর নতুন করে তৈরি হওয়া একটি হ্রদ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বন্যার স্থানে তৈরি হওয়া হ্রদটির পানি বাড়তে থাকায় সেটি ভেঙে দ্বিতীয় দফায় বন্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এ কারণে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। পরে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাযোগ্য বলে মনে হওয়ায় অভিযান আবার শুরু করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা হ্রদটির প্রাকৃতিক বাঁধকে অত্যন্ত অস্থিতিশীল বলে সতর্ক করেছেন।

 

আল জাজিরার প্রতিবেদনে কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব আর্কটিক অ্যান্ড আলপাইন রিসার্চের হিমবাহ ঝুঁকি বিশেষজ্ঞ আলটন বায়ার্স বলেন, হ্রদটি আটকে রাখা বাঁধটি মূলত আলগা ধ্বংসাবশেষ দিয়ে তৈরি। তার ভাষায়, সেখানে “খুব বেশি কিছু ধরে রাখার মতো নেই”। নিরাপদ পরিস্থিতি হিসেবে তিনি ধীরে ধীরে প্রাকৃতিকভাবে পানি বের হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। প্রয়োজনে চীনা উদ্ধারকারীরা হাতের সরঞ্জামসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে হ্রদের পানি কমানোর চেষ্টা করতে পারেন বলেও তিনি জানান।

 

দুর্যোগের কারণ নিয়েও প্রাথমিক ধারণা পরে বদলেছে। নেপালের কর্মকর্তারা প্রথমে জানিয়েছিলেন, ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে গিয়ে আকস্মিক বন্যা হতে পারে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, সেটি প্রকৃত ভূমিকম্প ছিল না। হিমবাহের শিলা ও বরফ আকস্মিকভাবে ধসে পড়ার সময় যে ভূকম্পনীয় শক্তি তৈরি হয়েছিল, সেটিই ভূমিকম্পের মতো সংকেত সৃষ্টি করেছিল।

 

আল জাজিরা জানায়, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় হিমবাহের একটি অংশ ধসে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে নেমে আসে। পথে শিলা ও ধ্বংসাবশেষ সঙ্গে নিয়ে সেটি লেন্দে নদীতে আঘাত করে। সেখান থেকে সৃষ্ট প্রবল স্রোত নেপালের রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ত্রিশূলী নদীর পানি মাত্র ৩০ মিনিটে ৯ মিটার বেড়ে যায়।

 

নেপালের দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের পাশাপাশি জরুরি সামগ্রীও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ভারতের দেওয়া তাঁবু, খাবার ও ওষুধ হেলিকপ্টারে করে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। আগে দেওয়া তথ্যমতে, নেপালে ৫ হাজারের বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য উদ্ধার অভিযানে যুক্ত হয়েছেন।

 

নেপাল সরকার উদ্ধার তৎপরতায় ভারতের ও চীনের কাছ থেকে বিশেষায়িত সহায়তা চেয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুড়ঙ্গ থেকে মানুষ উদ্ধারের মতো বিশেষ কাজে দক্ষ দল পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষের জীবন ঝুঁকিতে থাকায় এ সহায়তা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

 

দুর্যোগের পর বিভিন্ন দেশের নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন। আগের নেপালি পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নেপালে নিখোঁজ ৯১০ জনের মধ্যে ৫০০-এর বেশি বিদেশি ছিলেন। তাদের মধ্যে ভারতের ১৭৭, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪, যুক্তরাজ্যের ৩৩ এবং কানাডার ২৫ নাগরিকের তথ্য দেওয়া হয়েছিল। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, নেপালে প্রায় ১০০ চীনা নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। তিব্বতের গিয়েরং কাউন্টিতে ৫৫৮ নিখোঁজের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি। এই সংখ্যাগুলো যোগ করে মোট বিদেশি নিখোঁজের কোনো নতুন সংখ্যা তৈরি করা হয়নি।

 

দুর্যোগে পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরাও আটকা পড়েছেন। হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছে পবিত্র মাউন্ট কৈলাশ ও মানস সরোবরের দিকে যাতায়াতের পথেও এই বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছে।

 

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক মিনেল ফার্নান্দেজ বলেন, দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোই উদ্ধারকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভেঙে যাওয়া সড়ক ও সেতুর কারণে জীবিতদের কাছে পৌঁছানো কঠিন হচ্ছে। আহতদের চিকিৎসার জন্য সরকারি ও বেসরকারি হেলিকপ্টারও কাজে লাগানো হচ্ছে। চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্যে আহতদের মধ্যে পাঁজরের হাড় ভাঙা ও ত্বকে পোড়া ধরনের আঘাতের কথা উঠে এসেছে।

 

নেপালের রাসুয়ার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিকের চোখে দুর্গত এলাকার চিত্র আরও ভয়াবহ। তিনি বলেন, “চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ। নদীর পাশের বসতিগুলো পুরোপুরি ভেসে গেছে। আমার নিজের পাঁচজন আত্মীয়ও নিখোঁজ।”

 

দুর্যোগের পর আন্তর্জাতিক সহায়তাও আসতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর একজন দুর্যোগ মোকাবিলা বিষয়ক পরামর্শক পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে এবং জরুরি সহায়তা হিসেবে ৫ লাখ ডলার দেওয়ার কথা জানিয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয়ের প্রধান টম ফ্লেচার নেপালের ত্রাণ কার্যক্রমে জাতিসংঘের গ্লোবাল ইমার্জেন্সি ফান্ড CERF থেকে ২০ লাখ ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

 

যুক্তরাজ্যও নেপাল সরকারকে ৫০ লাখ পাউন্ড সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ভয়াবহ ও মর্মান্তিক বলে উল্লেখ করেছেন। ৩০ জনের বেশি ব্রিটিশ নাগরিক নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন বলেও জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে জরুরি উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাবও দিয়েছে যুক্তরাজ্য।

 

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এর আগে জানিয়েছিলেন, নেপালের দুর্গত জনগোষ্ঠীর কাছে জরুরি ত্রাণ ও সহায়তা পৌঁছে দিতে জাতিসংঘের দল কাজ করছে। ভারতও দুর্গত এলাকায় ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তার মধ্যে রেড ক্রস ফেডারেশন, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার কথাও আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং বৃহস্পতিবার তিব্বতের গিয়েরং এলাকায় দুর্যোগস্থল পরিদর্শন করেন। চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিনি জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সেখানে যান। এর আগে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং উদ্ধার পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং হিমবাহের হ্রদগুলোর ওপর নজরদারি জোরদারের নির্দেশ দেন।

 

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, দুর্গম এলাকা এবং সীমিত অবকাঠামোর কারণে পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বন্যাকে “ধ্বংসাত্মক” হিসেবে বর্ণনা করে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছেন।

 

জলবায়ু ও জননীতি বিশেষজ্ঞ সুনীল আচার্য আল জাজিরাকে বলেন, এই বন্যা নেপালের জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ার বিষয়টি সামনে এনেছে। তার ভাষায়, এটি শুধু অনিশ্চিত একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং জলবায়ু সংকটের সম্মুখসারিতে বসবাসের নির্মম উদাহরণ। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় নেপালের একার পক্ষে যথেষ্ট করা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বৈশ্বিক উষ্ণতা আরও বাড়িয়ে এমন ক্ষয়ক্ষতি তৈরি না করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

 

উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও দুর্গম এলাকায় এখনো পৌঁছাতে না পারায় মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ আপডেটগুলোতে দেখা যাচ্ছে।