প্রতিবেশী দেশগুলোতে জল ও স্থলপথে পাচার হচ্ছে সার

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের কৃষকরা সার নিয়ে এখন দিশেহারা। হচ্ছে আন্দোলন। গুদাম ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে। সরকার নির্ধারিত দামে সার দুর্লভ। এমনকি কোথাও বেশি দাম দিয়েও মিলছে না সার। এমন পরিস্থিতিতে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ সার জল ও স্থলপথে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচার হয়ে যাচ্ছে। দিনের পর দিন কক্সবাজার, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর ও সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে পাচার হচ্ছে সার। বাড়তি লাভের আশায় সার ডিলার ও সার পরিবহন ব্যবসায়ীদের একটি অসাধু চক্র এর সাথে জড়িত। বিজিবি, কোস্ট গার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে একের পর এক সারের চালান আটক হলেও তা বন্ধ করা যাচ্ছে না।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশ থেকে সার প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ও ভারতে পাচার হচ্ছে। সার আমদানিতে সরকার ভর্তুকি দেয়ায় ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে সারের মূল্য কম। আর মিয়ানমারে বাংলাদেশের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি সারের দাম। এদেশের ১ হাজার ৩৫০ টাকা বস্তার ইউরিয়া সার পাচারকারীরা বর্তমানে মিয়ানমারে ৮ হাজার টাকাই বিক্রি করছে। সরকার চলতি মাসে কক্সবাজারের জন্য ইউরিয়ার ১ হাজার ৮৪৩ টন চাহিদার বিপরীতে ২ হাজার ৩৪৩ টন, টিএসপি ৪৭৫ টন, ডিএপি ৭৮৯ টনের বিপরীতে ৮৮৯ টন এবং এমওপি ৩৬৮ টন বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। কিন্তু পাচার বন্ধ না হলে অতিরিক্ত বরাদ্দকৃত সার পাচার হওয়ার শঙ্কা থাকে। অভিযোগ রয়েছে, ডিলাররা এমন অনেকের কাছেই খুচরা সার বিক্রি করছে যারা কৃষক নয়। এ সুযোগ নিয়ে চক্রের সদস্যরা সার মজুদ করে পাচার করে। ফলে প্রান্তিক কৃষকরা সার না পেলেও ঠিকই পাচ্ছে পাচারকারীরা।

 

সূত্র জানায়, চলতি বছরের জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোস্ট গার্ড ও বিজিবি কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্ত থেকে জব্দ করে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯০৮ কেজি সার। ওসব ঘটনায় ১১৭ জনকে আটক করে সার পাচারের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। মূলত নৌকার মাঝি, উপকূল ও সীমান্তঘেঁষে বসবাসকারী ও ভাড়া করা লোকজন কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া, নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু, ঘুমধুমসহ নানা উপকূলীয় রাস্তা ব্যবহার করে সার পাচার করছে। মাঝেমধ্যে সারবোঝাই ট্রলার, কার্গো বোট ও বহনকারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে আটক হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে পাচারের নেপথ্যে থাকা মূল হোতারা। ফলে একের পর এক চালান জব্দ হলেও সার পাচারের অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ হচ্ছে না। সাগরপথের পাশাপাশি স্থল ও নদীপথের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টও চোরাকারবারিরা ব্যবহার করছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কপথ ও কর্ণফুলী নদীর মোহনা ও বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা দিয়ে মিয়ানমারে প্রতিনিয়ত সার পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে সার পাচারের বিপরীতে দেশে আসছে ইয়াবা, আইসের মতো মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র। এর সাথে সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র জড়িত।

 

সুত্র আরো জানায়, কিছু অসাধু ডিলার, কৃষক, নৌকার মাঝি ও উপকূলে বসবাসকারী লোকজন টাকার লোভে পাচারকারী চক্রের হয়ে কাজ করছে। ওই চক্রটি জড়িত মাদক কারবার ও মানবপাচারেও। মিয়ানমার পণ্য নিয়ে মাদক দেয়। আর মাদক পাচারকারীরা এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। উখিয়া ও টেকনাফের অন্তত ১৫টি পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারে সার পাচারের অভিযোগ রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম প্রধান রুট হচ্ছে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আনজুমানপাড়া। তাছাড়া টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের উলুবনিয়া, হারাইঙ্গাঘোনা, ঝিমংখালী, কানজরপাড়া, তুলাতলি, কোনারপাড়া ও আমতলী এবং হ্নীলার লেদা, দমদমিয়া খাল, হ্নীলা বাজার, স্টেশন ও রঙ্গিখালীকেও স্থানীয়ভাবে পাচারের রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী অধিকাংশ স্থানকে পাচারের পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

 

এদিকে সার পাচার ও অতিরিক্ত দাম নেয়াসহ নানা অভিযোগে জেলা প্রশাসন ও কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে তদন্ত চালাচ্ছে। ইতিমধ্যে সীমান্তবর্তী এলাকার প্রায় ১০ থেকে ১২ জন ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কৃষি সমপ্রাসারণ অধিদপ্তর অনিয়মে জড়িতদের নিয়ে কালো তালিকা করেছে।

 

অন্যদিকে এ বিষয়ে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার বিএন সাব্বির আলম সুজন জানান, অভিযানে যারা আটক হয় তাদের অধিকাংশই শ্রমিক। তাদের সাথে কথা বলে মামলায় মূলহোতাদের আসামি করার চেষ্টা করা হয়। আর তার দায়িত্ব তদন্ত কর্মকর্তার। তদন্তকারী সংস্থাই সার পাচারের সঙ্গে জড়িতরা আর কী কী ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত তা বলতে পারবে।

 

এ প্রসঙ্গে টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান জানান, অভিযানের সময় যাদের হাতেনাতে ধরা হয়েছে তাদের আসামি করার পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যে কিংবা প্রাথমিকভাবে ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে যাদের নাম পাওয়া গেছে, তাদের আসামি করা হয়েছে।