বন্ধ হচ্ছে না পুলিশের ওপর হামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

জুলাই আন্দোলনকালে দেশজুড়ে পুলিশ বাহিনীর ওপর ব্যাপক হামলা হয়। তবে বিগত দুই বছরে ওই হামলার পরিমাণ কিছুটা কমে এলেও এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে পুলিশের উপর ২৭১টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। তাছাড়া এখনো বহু জায়গায় পুলিশের ওপর হামলা করে ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে আসামি। বিগত ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে গত মে মাস পর্যন্ত পুলিশের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ৮৭০টি। এমন পরিস্থিতিতে দেশের পুলিশ বাহিনী এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। যদিও বর্তমানে অনেক বেড়েছে পুলিশের তৎপরতা। কিন্তু তারপরও বন্ধ হচ্ছে না পুলিশের বিরুদ্ধে মব করে আসামি ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা। বরং অভিযান চালাতে গিয়ে অহরহ আক্রান্ত হচ্ছে পুলিশ। এমন পরিস্থিতি মনোবলের জায়গায় পিছিয়ে পড়ছে পুলিশ। পুলিশ বাহিনী সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জুলাই আন্দোলনের সময় সারা দেশে আক্রান্ত হয় পুলিশের ৪৬০টি স্থাপনা। তার মধ্যে ৫৮টি থানা ও ২৬টি ফাঁড়িসহ মোট ২২৪টি স্থানে আগুন লাগানো হয় আর ৫৬টি থানা ও ২৪টি ফাঁড়িসহ ২৩৬টি স্থাপনায় ভাঙচুর চালানো হয়। তখন ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮টি গুলি লুট হয়। তার মধ্যে এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এক হাজারের বেশি অস্ত্র। তাছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত থানা ও ফাঁড়িগুলো গণপূর্ত ও পুলিশ সদর দপ্তরের তত্ত্বাবধানে মেরামত করে কাজ শুরু করা হয়েছে। তবে পুলিশ বাহিনী এখনো ভুগছে তীব্র যানবাহন সংকটে।

 

সূত্র জানায়, রাজধানীর আদাবরে অভিযানে গিয়ে অতিসম্প্রতি থানার ওসি ও এক এসআই ছিনতাইকারীদের হামলায় আহত হয়। একই দিনে লালমনিরহাটের আদিতমারীতে পুলিশের হাতে আটক দুজনকে ছিনিয়ে নিতে স্থানীয়দের হামলায় এনডিসি, পুলিশ সদস্যসহ ৩০-৩৫ জন আহত হয়। তখন সরকারি ৬টি গাড়িও পুড়িয়ে দেয়া হয়। তার কয়েকদিন আগে কুমিল্লার বুড়িচংয়ে মহাসড়কে নিষিদ্ধ তিন চাকার যান আটককে কেন্দ্র করে হাইওয়ে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ও পুলিশ সদস্যদের মারধরের ঘটনা ঘটে। বর্তমানে পুলিশ সদস্যরা আসামি গ্রেফতার, অপরাধবিরোধী অভিযান কিংবা আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে আক্রমণে বা প্রতিরোধের মুখে পড়ছে। পুলিশের সদস্যরা। ওসব ঘটনায় শুধু পেশাদার অপরাধীরা নয়, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ, আসামির স্বজন কিংবা সংঘবদ্ধ দলও পুলিশের ওপর হামলায় জড়াচ্ছে। তাছাড়া কোথাও কোথাও মব তৈরি করে অপরাধী বা আসামিকে নিজেদের হাতে নিয়ে বিচার করতে চাচ্ছে।

 

সূত্র আরো জানায়, অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার অতীতেও পুলিশের সদস্যরা হয়েছে। বিগত ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ৬০০টির মতো হামলার ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে ২০২৫ সালে পুলিশ আক্রান্ত হয়েছে ৬০১টি ঘটনায়। তবে সামপ্রতিক সময়ে পুলিশের ওপর হামলাগুলোর ধরনে পরিবর্তন এসেছে। আগে অনেক সময় দূর থেকে, নির্জন স্থানে বা রাতের আঁধারে হামলার ঘটনা ঘটলেও এখন প্রকাশ্যে হামলার ঘটনা ঘটছে। বর্তমানে পুলিশ সদস্যরা আসামি ধরতে গেলে তাদের ঘিরে ফেলা, অভিযানে বাধা, কুপিয়ে জখম, গুলি, আসামি ছিনতাই ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা বেশি ঘটছে। তাছাড়া শুধু পুলিশ নয়, র‍্যাব, কোস্ট গার্ড, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ অন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপরও ঘটছে হামলার ঘটনা। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হামলায় র‍্যাব-৭-এর উপ-সহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হয়। তার আগে ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারায় যৌথ বাহিনীর অভিযান চলাকালে ডাকাতদের হামলায় নিহত হন সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট তানজিম ছরোয়ার।

 

এদিকে জুলাই আন্দোলনের পর ক্ষমতার পটপরিবর্তনে পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বেও এসেছে বড় রদবদল। কিন্তু তারপরও পুলিশের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ও অভিযানে এখনো এখনো সার্বিকভাবে নানা দুর্বলতা রয়েছে। পুলিশে সংস্কার আনতে একটি কমিশন গঠনের কথা থাকলেও তা হয়নি। ফলে পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরে বড় ধরনের কোনো সংস্কার হয়নি। পাশাপাশি পুলিশ বাহিনী এখনো সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে পুলিশ পিছিয়ে রয়েছে। যে কারণে বারবার হামলার শিকার হয়েও তা তারা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। পুলিশের বর্তমান নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসলেও মূলধারার পুলিশিং কাজে পর্যাপ্ত দক্ষতা দেখাতে পারছে। পাশাপাশি আস্থার ঘাটতি ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতার কারণে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে না শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশ। আর ওই সুযোগকে কাজে লাগাছে নতুন নতুন অপরাধী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।

 

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, পুলিশ কমিশন গঠন নিয়ে সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে এখনো দ্বিধা রয়েছে। বর্তমানে মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া এবং সামান্য বিষয়েই প্রতিবাদী হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তবে আগের তুলনায় পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। পুলিশ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং সরকারও এ বিষয়ে আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।