বাংলাদেশি রোগীদের বিদেশে চিকিৎসা খরচ বেড়েই চলেছে

ফাইল ছবি

মোঃ সাকিক হারুন ভূঁইয়া :

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে আস্থার সংকটের কারণে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে। এ কারণে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে, যার মধ্যে ভারতের দিকে চলে যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি অর্থ। প্রতি বছর প্রায় ২৫ লাখ বাংলাদেশি রোগী ভারতে চিকিৎসা নিতে যায়, যা ৬ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছে। তবে, সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণে গুরুতর রোগী ছাড়া ভারত বাংলাদেশি রোগীদের ভিসা দিচ্ছে না, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দেশে স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। চিকিৎসা খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে চিকিৎসা নিতে গিয়েও রোগীরা অত্যধিক খরচের শিকার হচ্ছেন। ভারতে একই চিকিৎসা যা বাংলাদেশে সম্ভব, সেখানে দ্বিগুণ খরচ হয়, আর থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার খরচ বাংলাদেশের চেয়ে তিন থেকে ১০ গুণ বেশি। তবুও, আর্থিকভাবে সক্ষম মানুষের মধ্যে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা দিন দিন বেড়ে চলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত বছর বাংলাদেশের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীরা ভারতীয় সেবা ও চিকিৎসা খাতে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারত ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশের ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ৭৩ কোটি টাকা খরচ হয়েছে এবং মার্চে এ পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১০৩ কোটি টাকায়। এর বড় একটি অংশ চিকিৎসার জন্য ব্যয় হয়েছে।

এদিকে, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব জানিয়েছেন, দেশের জনগণের মধ্যে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মানসিক আস্থার অভাব। তিনি বলেন, “দেশের হাসপাতালগুলোর উন্নয়ন ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাবের কারণে রোগীরা বিদেশে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন।”

ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণে বর্তমানে ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশি রোগীদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। গুরুতর রোগী ছাড়া ভারত এখন আর বাংলাদেশিদের ভিসা প্রদান করছে না। ক্যান্সার, কিডনি, হৃদরোগ, লিভার সমস্যার মতো রোগে আক্রান্তরা ভারত যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু এখন, এই রোগীরা ভারতে চিকিৎসা নিতে না পারায় তাদের অনেকেই থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা নিচ্ছেন, যদিও সেখানে চিকিৎসা ও ভ্রমণ খরচ বহন করার ক্ষমতা অনেকেরই নেই।

স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এক অনুষ্ঠানে বলেন, “দেশের চিকিৎসকদের দক্ষতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু রোগ শনাক্তকরণের জন্য আরও উন্নত ডায়াগনস্টিক টেস্ট রিপোর্টের প্রয়োজন রয়েছে। মানসম্পন্ন সেবা দিলে রোগীরা আর বিদেশে যাবে না।” তিনি আরো বলেন, “চিকিৎসা ব্যবসা নয়, এটি একটি জাতির কল্যাণের বিষয়। সরকারের পাশাপাশি সকলকেই দায়িত্ব নিতে হবে, কারণ দেশে চিকিৎসা খাতে সমন্বয়হীনতা, জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকট রয়েছে।”

বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসায় এখনও কিছুটা পিছিয়ে থাকার কারণে রোগীরা বিদেশে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। দেশে স্বাস্থ্য সেবা খাতের উন্নয়ন হলে বিদেশে চিকিৎসার প্রবণতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।