নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় অর্থ পরিমাণ দ্রুতগতিতে বাড়ছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশীদের বিগত ৬ বছরে অর্থের পরিমাণ বেড়েছে তিন গুণের বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক দেশের ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বরাদ্দের চেয়েও বেশি ওই অর্থের পরিমাণ। চলতি অর্থবছরে ওই ব্যয় পৌঁছাতে পারে ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারের কাছাকাছি। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। আর চলতি অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য মোট বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। যার পরিমাণ প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে প্রায় ৮৮ কোটি ডলার। কিন্তু বিদেশে উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশীদের পাঠানো ব্যয় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ৭৩ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং শিক্ষাখাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ব্যাংকিং চ্যানেলে বিগত কয়েক অর্থবছর ধরে বিদেশে উ” শিক্ষায় অর্থ পাঠানোর পরিমাণ ক্রমাগত ও দ্রুদগতিতে বাড়ছে। বিগত ২০১৯-২০ অর্থবছরে যেখানে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ২১ কোটি ৮০ লাখ ডলার। কিন্তু পরবর্তী অর্থবছরগুলোতে তা বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৪ কোটি ৩১ লাখ ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪১ কোটি ৪৫ লাখ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫২ কোটি ৮ লাখ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ব্যয় বাবদ বিদেশে পাঠানো হয় ৫৩ কোটি ৩২ লাখ ডলার। তারপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওই ব্যয় আরো বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার এবং সর্বশেষ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে তা বেড়ে পৌঁছেছে ৭৩ কোটি ৬ লাখ ডলারে। যা ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি।
সূত্র জানায়, শিক্ষার মানের ক্রমাগত নিম্নগতিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী শিক্ষার্থী প্রতি বছর উ” শিক্ষার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিচ্ছে বিদেশ। বর্তমানে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হয়ে উঠেছে মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১১ হাজার ৪০১ জন। বিগত এক বছরে ওই দেশটিতে প্রায় ৪৫ শতাংশ বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের ভর্তি বেড়েছে। তবে বাংলাদেশ থেকে বিগত ২০২৩ সালে ৫২ হাজার ৭৯৯ শিক্ষার্থী পড়াশোনার জন্য ৫৫টি দেশে গেছে। ২০২২ সালে ওই সংখ্যা ছিল ৪৯ হাজার ১৫১ জন এবং ২০২১ সালে ৪৪ হাজার ৩৩৮ জন। আর এক দশক আগে ২০১৩ সালে ২৪ হাজার ১১২ জন বিদেশে পড়তে গিয়েছিলো। ১০ বছরের ব্যবধানে বিদেশগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। সামপ্রতিক সময়ে ওই সংখ্যা আরো বেড়েছে। কিন্তু আশঙ্কার কথা হচ্ছে অনেক শিক্ষার্থী উ” শিক্ষাকে বিদেশ গমনের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের বেশির ভাগ আর ফিরছে না দেশে।
সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশের বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশেরই যুক্তরাষ্ট্র লক্ষ্য থাকে। কিন্তু সামপ্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিধিনিষেধের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসাপ্রাপ্তি তুলনামূলক কঠিন হয়ে উঠেছে। কিন্তু তারপরও সর্বশেষ শিক্ষাবর্ষেও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশে শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিগত ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ২০ হাজার ১৫৬ জনে দাঁড়িয়েছে। তার আগে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিলো ১৭ হাজার ৯৯ জন। আর গত ৬ শিক্ষাবর্ষের তুলনা করে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা এ সময়ে ১২৮ শতাংশ বেড়ছে। ওই শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে ৮ হাজার ৮৩৮ জন অধ্যয়নরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থী ছিলো। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে বাড়ছে জাপানগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। দেশটিতে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার ৭৪৮ জন শিক্ষার্থীর ভর্তি হয়েছিলো। আর ২০২৪ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য জাপানে পাড়ি জমিয়েছিলো ৭ হাজার ৫৯৭ বাংলাদেশী শিক্ষার্থী।
এদিকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ মানুষ। দেশের উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের ৫৮ দশমিক ৭৩ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্নদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরতদের হার ৭০ দশমিক ৭১ শতাংশ। দেশে চাহিদা অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় দিনের পর দিন বেকার থাকছে উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বড় অংশ। ফলে বেকারত্বের হার উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যেসবচেয়ে বেশি। বর্তমানে উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ১১ শতাংশ, উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্নকারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ আর এর কম শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্নদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩ শতাংশেরও কম।
অন্যদিকে শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার্থীরা দুটো কারণ বিদেশ ছুটছে। এর একটি হচ্ছে শিক্ষার মান আর আরেকটি মানসম্মত কর্মজীবন। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ। ফলে ভালো গবেষণায় আগ্রহীরা আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষালাভ করতে উচ্চশিক্ষার বিদেশে যেতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী তৈরি হয়নি কর্মসংস্থান। সেজন্যই বিপুলসংখ্যক উচ্চ শিক্ষিত তররুণ বেকার রয়েছে। দেশের মেধাবী তরুণদের দেশে রাখতে চাইলে অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান ও নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা দিতে হবে। বর্তমানে যে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী দেশের বাইরে যাচ্ছে, তাদের কাছে বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে শিক্ষার মানের থেকেও রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক অবস্থা বড় কারণ। তরুণরা দেশে কোনো ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে না। এজন্যই তারা যেকোনোভাবে দেশ ত্যাগে আগ্রহী হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরীর জানা, শিক্ষার্থীদের বিদেশমুখী হওয়ার একটি প্রধান কারণ হলো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং তা সমপ্রসারণে নীতিনির্ধারকদের সীমিত অগ্রগতি। দেশের শিক্ষার নীতিনির্ধারণী সংস্থা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টিতে ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে। সেজন্যই মূলত শিক্ষার্থীদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা এবং সেই সঙ্গে শিক্ষার পেছনে অভিভাবকদের ও দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। সরকার যদি এ বিষয়ে দ্রুত নজর দিয়ে দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা (ক্যাপাসিটি) না বাড়ায়, তবে এ সংকট কাটানো সম্ভব নয়। দেশে উচ্চ শিক্ষার সুযোগের সংকোচন যতদিন থাকবে, তরুণরা ততদিন বিদেশমুখী হবে। তাতে বাংলাদেশ বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার পাশাপাশি মেধাবীদের পরোক্ষভাবে বাধ্য করা হবে দেশ ছাড়তে।











