নিজস্ব প্রতিবেদক:
দফায় দফায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া রাজধানীর মিরপুর এলাকা দীর্ঘ প্রায় ৫ ঘণ্টা পর পুরোপুরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এসেছে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে জড়িতদের গ্রেফতারে জোরেশোরে তল্লাশি চালাচ্ছে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা রাস্তা থেকে সরে যাওয়ায় ওই অঞ্চলে এখন পুরোপুরি যানচলাচল শুরু হয়েছে।
পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ নাছের সংবাদকর্মীদের সাথে আলাপকালে জানান, পোশাক শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে মজুরি বোর্ড গঠনের পরও তারা যেভাবে এই আন্দোলন চালিয়ে গেছেন, তাতে স্পষ্ট মনে হচ্ছে তাদের ভেতরে একটি কুচক্রী গোষ্ঠী উসকানি দিচ্ছে। আমরা সফলভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছি এবং স্বাভাবিক যানবাহন চলাচলও শুরু হয়েছে। এছাড়া যেসব দুষ্কৃতকারী ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে সরাসরি জড়িত ছিল, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে আমাদের জোরালো অভিযান চলমান রয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় রবিবার সকাল ৯টার দিকে, যখন মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার পোশাক শ্রমিক খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে জড়ো হতে শুরু করেন। এর ঠিক পরপরই সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তারা মূল সড়কে অবস্থান নিয়ে তীব্র অবরোধ সৃষ্টি করেন। এ সময় তারা নিজেদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এরপর বেলা ১১টার দিকে পুলিশ তাদের বুঝিয়ে সড়ক ছেড়ে দেওয়ার বিনীত অনুরোধ করলে আন্দোলনকারী শ্রমিকরা আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিতে থাকেন।
আন্দোলনরত একজন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে বাজারে সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হলেও আমাদের মতো সাধারণ শ্রমিকদের কোনো বেতন বাড়ানো হয়নি। আমরা মানবেতর জীবনযাপন করে অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। যেকোনো মূল্যে আমাদের বেতন বাড়াতেই হবে এবং যতদিন পর্যন্ত বেতন বাড়ানোর দাবি আদায় না হবে, ততদিন আমাদের এই আন্দোলন চলবে।
আরেক নারী শ্রমিক সাবিহা অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে জানান, আমরা সম্পূর্ণ ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবি নিয়েই রাজপথে নেমেছি। আমাদের এই দাবি যদি কর্তৃপক্ষ মেনে না নেয়, তবে আমরা কোনো অবস্থাতেই সড়ক ছেড়ে যাব না।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় বেলা সোয়া ১১টার দিকে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে ধাওয়া দেওয়া শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে পুলিশ ও শ্রমিকদের উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এ সময় ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা রাস্তার পাশের বিভিন্ন দোকানপাটে ব্যাপক ভাঙচুর চালান এবং একপর্যায়ে তারা যমুনা ব্যাংকের গ্লাসও ভেঙে ফেলেন। আন্দোলনকারীদের নিবৃত্ত ও ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ এ সময় মুহুর্মুহু টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং জলকামান থেকে পানি নিক্ষেপ করে। একটানা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলা এই সংঘর্ষে পুরো এলাকা একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত পুলিশের ধাওয়ার মুখে টিকতে না পেরে শ্রমিকরা চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েন এবং মিরপুর-১০ নম্বর চত্বরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয় পুলিশ। এরপর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ওই এলাকায় সীমিত আকারে যানবাহন চলাচল শুরু হয়।
কিন্তু বেলা সাড়ে ১২টার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই শ্রমিকরা পুনরায় মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় এসে একত্রিত হন এবং আবারও অত্যন্ত শক্তভাবে সড়কে অবস্থান নেন। এ সময় তারা রাস্তার মাঝখানের ভারী ডিভাইডার ভেঙে মূল সড়কে ফেলে রাখেন, যার ফলে যানচলাচল চরমভাবে বিঘ্নিত হয়। এরপর মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় অবস্থিত মেট্রোরেলের ঠিক নিচে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের একটি গাড়িতে তারা অগ্নিসংযোগ করেন। এই ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে আসার চেষ্টা করলে পোশাক শ্রমিকরা তাদের গাড়িটিকেও ধাওয়া করেন। এমন উত্তপ্ত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে পুলিশ আবারও কঠোর অ্যাকশনে যেতে বাধ্য হয় এবং দুই পক্ষের মধ্যে পুনরায় তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। শ্রমিকদের সড়ক থেকে হটানোর জন্য পুলিশ দফায় দফায় টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে থাকে। মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় প্রায় এক ঘণ্টা ধরে এই সংঘাতময় পরিস্থিতি বজায় থাকে এবং দুপুর ২টার দিকে পুলিশের জোরালো অ্যাকশনের মুখে পড়ে পোশাক শ্রমিকরা অবশেষে পিছু হটেন ও সড়ক ছেড়ে চলে যান।
এদিকে সকাল থেকেই মিরপুর-১০ নম্বর চত্বর অবরোধ করে রাখার কারণে ওই অঞ্চলের সব ধরনের যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হন। বিশেষ করে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে যারা নিজেদের অফিসসহ বিভিন্ন জরুরি কাজে সকালে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন, তাদের ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। মিরপুরের এই প্রধান সড়ক অবরোধের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে রাজধানীর অন্যান্য সড়কেও; চারপাশের রাস্তায় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ তৈরি হওয়ায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এছাড়া যারা জরুরি প্রয়োজনে মিরপুর এলাকা থেকে বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তাদের অনেকেই বাধ্য হয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে নিজ নিজ গন্তব্যে ও অফিসে পৌঁছান।











