রাজধানীর নড়াই নদী: অদৃষ্টের শিকার, মৃত নদী ফিরে আসবে কি?

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজধানীর রামপুরা সেতু ও বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনের মাঝ দিয়ে পুব দিকে ত্রিমোহিনীর দিকে চলে গেছে প্রশস্ত একটি সড়ক। এই সড়কটি দিয়ে হাঁটতে গেলে, সিটি করপোরেশনের ময়লা ভাগাড়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার ফলে এক অস্বস্তিকর দুর্গন্ধ মানুষের নাকের ভেতরে ঢুকে পড়ে। সড়কের একপাশে নদীটি রয়েছে, যা বর্তমানে একটি মরা খালের মতো দেখতে, অথচ একসময় এটি ছিল নড়াই নদী।

নদীটি এখন প্রায় মৃত। তার তীর ঘিরে কংক্রিটের বেড়া এবং সিটি করপোরেশনের ময়লা ফেলার জায়গা তৈরি হয়েছে। ময়লা ফেলার জন্য এখানে আরো কিছু উন্মুক্ত ময়লা ভাগাড় গড়ে উঠেছে, যার কারণে আশপাশের বাসিন্দাদের জন্য দুর্ভোগ বেড়েছে। বিশেষ করে, বনশ্রী ও আফতাবনগরের বাসিন্দারা প্রতিদিন এই নদীর দূষণ ও দুর্গন্ধের সঙ্গে বসবাস করছেন।

স্থানীয়রা জানান, ১৯৯১ সালের দিকে, আফতাবনগর থেকে নৌকায় করে বনশ্রী আসার সময় নদীটি ছিল উত্তাল। তখন এটি সীতালক্ষ্মীর শাখা নদী হিসেবে পরিচিত ছিল। সময়ের সঙ্গে নদীটির বালু দিয়ে ভরাট করা শুরু হয়, বিশেষ করে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে। তারপর ধীরে ধীরে বনশ্রী ও আফতাবনগর এলাকাটি ভরাট হয়ে গিয়ে বড় বড় ভবন নির্মাণ করা হয়। অনেকেই এই নদীটিকে ‘গন্ধরাজ খাল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, কারণ নদীটি এখন একটি দূষিত জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।

শরীফ জামিল, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জানান যে, নদীটি এক সময় হাতিরঝিলের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল, কিন্তু রামপুরা ব্রিজ নির্মাণের পর এটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এরপর শহরের নকশার পরিবর্তন এবং সিটি করপোরেশনের অবহেলা নদীটির এক সময়ের প্রমত্ততা এবং পরিচিতি হারিয়ে ফেলার দিকে নিয়ে গেছে।

এদিকে, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেছেন, “নড়াই নদী আমার আওতাধীন নয়, তবে আমরা এর পুনরুদ্ধারের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। আমাদের সীমিত অর্থায়ন এবং আমলাদের সহযোগিতা ছাড়া বড় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন।”

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের সাবেক চেয়ারম্যান, মনজুর আহমেদ চৌধুরী, বলেন, “নড়াই নদীটির অক্ষয় অবস্থা ফিরে পাওয়ার জন্য তেমন কোনো কার্যকর সমন্বিত পরিকল্পনা এখনও বাস্তবায়ন করা হয়নি। নদীটি যে প্রকল্পের অংশ, সেগুলোকে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার অধীনে নিয়ে আসতে হবে।”

অবশ্যই, নড়াই নদীটি ফিরে পেতে হলে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, জনগণ এবং পরিবেশবিদদের একত্রে কাজ করার পাশাপাশি সরকারী পর্যায় থেকে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক ও পরিকল্পনাগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। নদীটির অদৃষ্ট সংশোধন করা না গেলে, এই মরিচা পড়া নদীটি আরও বেশি গন্ধরাজ খালে পরিণত হবে, যার প্রভাব শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের উপর পড়বে না, বরং এর মধ্যে বাস করা পরিবেশও নষ্ট হয়ে যাবে।