রূপপুরে প্রথম ইউনিটে সফল পারমাণবিক বিক্রিয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিটে সফলভাবে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক চেইন বিক্রিয়া শুরু হয়েছে। রোববার (১১ অক্টোবর ২০২৬) বেলা ৩টা ৩৪ মিনিটে পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটির রিঅ্যাক্টর প্রথমবারের মতো ‘ক্রিটিক্যালিটি’ পর্যায়ে পৌঁছায়। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করল বাংলাদেশ। তবে এই পর্যায়ে পৌঁছানো মানেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়া নয়। আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানোর পর বিদ্যুৎ সরবরাহের পরবর্তী ধাপে যাওয়া হবে।

 

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান এই অগ্রগতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, চুল্লির গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি প্যারামিটার নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে এবং বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে।

 

পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়াম পরমাণুর বিভাজনের মাধ্যমে যে চেইন বিক্রিয়া তৈরি হয়, সেটি নিয়ন্ত্রিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে চলতে শুরু করার পর্যায়কে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ সময় পারমাণবিক শক্তি তাপশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। পরবর্তী ধাপে এই তাপশক্তি কাজে লাগিয়ে যান্ত্রিক শক্তি এবং শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়।

 

চূড়ান্তভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করতে হয়। ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি সেই প্রক্রিয়ার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এর পর রিঅ্যাক্টরের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, রিঅ্যাক্টর ফিজিক্স পরীক্ষা, বিভিন্ন সিস্টেম ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই এবং ধাপে ধাপে ক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলবে।

 

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানান, প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স নির্দেশিকা, কারিগরি প্যারামিটার ও বাহ্যিক সনদপত্র যাচাইয়ের পর চেইন বিক্রিয়া শুরুর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বেলা ৩টা ৩৪ মিনিটে বিক্রিয়া সফলভাবে শুরু হয় এবং সব প্যারামিটার কাঙ্ক্ষিত সীমার মধ্যে ছিল। রিঅ্যাক্টরও স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল।

 

তিনি আরও জানান, বিকিরণের মাত্রা নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। এখন পর্যন্ত পাওয়া কারিগরি তথ্য অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটারগুলো নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে।

 

গত ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ রূপপুরের প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। এর আগে ইউনিটটির স্বয়ংক্রিয় চাপ নিয়ন্ত্রণকারী নিরাপত্তা ভালভে কারিগরি সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এ কারণে ক্রিটিক্যালিটি অর্জনের প্রস্তুতি পিছিয়ে যায়। পরে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় সমস্যার সমাধান করা হয় এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করা হয়।

 

প্রকল্পের কমিশনিং কার্যক্রম আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নির্দেশিকা অনুসরণ করে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট তথ্যে বলা হয়েছে, প্রথম ইউনিটের ‘বি ওয়ান’ ধাপ মোটামুটি সফলভাবে শেষ হয়েছে। পরবর্তী ‘বি টু’ ধাপে প্রাথমিক পরিচালনার জন্য চুল্লিকে প্রস্তুত করা হয়। সেই প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় যাচাইয়ের পরই ক্রিটিক্যালিটি অর্জনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

 

প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন জানান, প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়েছে বিকেল পৌনে ৪টায়। তাঁর বক্তব্যে বিক্রিয়া শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এই ধাপের পর চুল্লির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।

 

রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত নেওয়ার পর বাণিজ্যিকভাবে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। এর আগে চুল্লির কার্যক্রম, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং গ্রিড সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।

 

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান জানান, ক্রিটিক্যালিটি অর্জনের পর রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটারগুলো নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। তাঁর মতে, এই অগ্রগতির ফলে প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সংযুক্ত হওয়ার বা ‘গ্রিড সিনক্রোনাইজেশন’-এর পথে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করেছে।

 

পরবর্তী পর্যায়ে অনুমোদিত কমিশনিং কর্মসূচি অনুযায়ী রিঅ্যাক্টর ফিজিক্স পরীক্ষা, বিভিন্ন সিস্টেম ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই, ধাপে ধাপে ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গ্রিড সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হবে।

 

প্রকল্প কর্মকর্তাদের হিসাবে, সব পরীক্ষা পরিকল্পনামতো এগোলে প্রথম ইউনিট থেকে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম চলতি বছরের নভেম্বরের শেষ নাগাদ প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আশা করছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামও নভেম্বরের শেষদিকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করার কথা জানিয়েছেন।

 

তবে বাণিজ্যিক সরবরাহ শুরুর আগে নির্ধারিত পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ধাপগুলো সম্পন্ন করতে হবে। তাই নভেম্বরের শেষদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রত্যাশা থাকলেও তা পরবর্তী কার্যক্রমের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে।

 

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে গত ২৮ এপ্রিল পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরু হয়। পরে রিঅ্যাক্টর কোরে ১৬৩টি জ্বালানি অ্যাসেম্বলি স্থাপন করা হয়। জ্বালানি লোডিংয়ের পর বিভিন্ন পরীক্ষা ও কমিশনিং কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ইউনিটটিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযোগী করে তোলার কাজ চলছে।

 

রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।

 

প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত চেইন বিক্রিয়া শুরু হওয়ায় প্রকল্পটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরও কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর আগে বাকি পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন করাই এখন পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কাজ।