লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে প্রযুক্তিপণ্যের দাম

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রযুক্তি পণ্যের সরবরাহ সংকট ও চড়া মূল্যের জেরে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে কম্পিউটার সামগ্রী এবং সাশ্রয়ী মোবাইল ফোনের দাম লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে বিভাগীয় শহর রাজশাহীসহ দেশের অঞ্চলভিত্তিক প্রযুক্তি বাজারগুলোতে কম্পিউটার পার্টস ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ক্রয়ক্ষমতা সাধারণ গ্রাহকের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, প্রসেসর, মাদারবোর্ড, ডিডিআর-৫ র‍্যাম, গ্রাফিক্স কার্ড এবং উচ্চগতির স্টোরেজ ডিভাইসের চড়া দামের কারণে ক্রেতারা নির্ধারিত বাজেটে কাঙ্ক্ষিত কনফিগারেশনের প্রযুক্তিপণ্য সংগ্রহ করতে পারছেন না। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার এবং তরুণ পেশাজীবীদের ওপর, যাদের একটি বড় অংশ বাজেট ঘাটতির কারণে নতুন পিসি কেনা কিংবা পুরোনো ডিভাইস আপগ্রেড করার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার অজুহাতে স্থানীয় আমদানিকারক ও পরিবেশক পর্যায়ে পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রসেসরের বাজারে ইন্টেল ও এএমডির বিভিন্ন মডেলের দাম পূর্বের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। ইন্টেলের আধুনিক আলট্রা সিরিজ থেকে শুরু করে ১৪তম ও ১৩তম প্রজন্মের মধ্যম সারির প্রসেসরগুলোর দাম বর্তমানে স্থানভেদে প্রায় ১৯ হাজার থেকে ৭২ হাজার টাকা পর্যন্ত স্পর্শ করেছে। একই সাথে এএমডির রাইজেন সিরিজের কার্যক্ষম প্রসেসরগুলো কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে প্রায় ১৯ হাজার থেকে সাড়ে ৪৭ হাজার টাকা। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে মেমোরি চিপের বাজারে; ডিডিআর-৪ র‍্যামের তুলনায় নতুন প্রযুক্তির ডিডিআর-৫ র‍্যামের দর লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। নামিদামি ব্র্যান্ডের ১৬ ও ৩২ জিবি ক্ষমতার ডিডিআর-৫ র‍্যামের বাজারমূল্য বর্তমানে ২৭ হাজার থেকে ৬৪ হাজার টাকা পর্যন্ত ঠেকেছে, যা এক বছর আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ। কম্পিউটার হার্ডওয়্যারের পাশাপাশি স্টোরেজ ডিভাইস ও গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিটের (জিপিইউ) দামেও চরম অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। জানা গেছে, উচ্চগতির এনভিএমই এসএসডি এবং ব্র্যান্ডেড পোর্টেবল হার্ডডিস্কের মূল্য এক বছরের ব্যবধানে ধারণক্ষমতাভেদে ক্ষেত্রবিশেষে দেড় থেকে আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে আগে একটি সাধারণ ২৫৬ জিবি এসএসডি ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটির জন্য ক্রেতাকে প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। গেমিং ও প্রফেশনাল কনটেন্ট ক্রিয়েশনের জন্য ব্যবহৃত এনভিডিয়া ও আসুসের এনট্রি লেভেলের গ্রাফিক্স কার্ডগুলোর দাম ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মডেলগুলোতে তা পৌনে দুই থেকে দুই লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আকস্মিক এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে স্থানীয় কম্পিউটার শপগুলোতে কেনাবেচায় তীব্র মন্দা নেমে এসেছে। অনেক খুচরা কম্পিউটার বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান আগে যেখানে মাসে ১৫টি পূর্ণাঙ্গ পিসি বিক্রি করত, তা এখন ৫টিতে নেমে এসেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্রেতারা দোকানে এসে যন্ত্রাংশের আকাশছোঁয়া দর শুনে কেনাকাটা না করেই ফিরে যাচ্ছেন। দেশের বাজারে তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের এই নজিরবিহীন অস্থিরতার পেছনে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বহুবিধ কারণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার অব্যাহত অবমূল্যায়ন আমদানিকৃত ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়ার প্রধান কারণ। বাংলাদেশ কম্পিউটার যন্ত্রাংশ ও আইসিটি ডিভাইসে প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের সামান্যতম প্রভাবও দেশীয় বাজারে তীব্রভাবে অনুভূত হয়। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অভূতপূর্ব প্রসারের ফলে বড় বড় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই সার্ভার ও হাই-পারফরম্যান্স কম্পিউটিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। ফলে বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টর চিপ, মেমোরি মডিউল এবং কপারসহ প্রয়োজনীয় ধাতব কাঁচামালের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক লজিস্টিকস ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটছে, যার মাসুল দিতে হচ্ছে প্রান্তিক ভোক্তাদের। এদিকে, একই চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে মোবাইল ফোনের বাজারেও। সূত্র মতে, একসময় ১০ হাজার টাকার মনস্তাত্ত্বিক সীমার মধ্যে র‍্যাম, মোটামুটি মানের ব্যাটারি ও বড় ডিসপ্লেসহ যে ধরনের এন্ট্রি-লেভেল স্মার্টফোন পাওয়া যেত, তা এখন একপ্রকার বাজার থেকে হারিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চিপসেট ও মেমোরি পার্টসের মূল্যবৃদ্ধি এবং স্থানীয় শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে ব্র্যান্ডেড কোম্পানিগুলোর সর্বনিম্ন স্তরের ফোনগুলোর দাম এখন ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। বাজারে বর্তমানে যে দু-একটি সাশ্রয়ী ফোন ১০ হাজার টাকার নিচে মিলছে, সেগুলোর কার্যক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। স্বল্প র‍্যাম ও দুর্বল প্রসেসরের কারণে দৈনন্দিন যোগাযোগের জরুরি অ্যাপ কিংবা মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করতে গিয়ে ব্যবহারকারীরা চরম ধীরগতির মুখোমুখি হচ্ছেন। ফলে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য একটি কার্যক্ষম স্মার্টফোন মালিকানা এখন বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্ট ও গবেষকরা নীতিগত সংস্কারের তাগিদ দিচ্ছেন। তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, আগামী দিনগুলোতে বিশ্ববাজারে ডিসপ্লে প্যানেল, কাঁচামাল এবং সেমিকন্ডাক্টরের দাম আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমতাবস্থায় দেশে ডিজিটালাইজেশনের গতি ধরে রাখতে এবং ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের ভোক্তা ও শিক্ষার্থীদের ব্যবহার্য এন্ট্রি-লেভেল ডিভাইস এবং অত্যাবশ্যকীয় কম্পিউটার হার্ডওয়্যার আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়া, স্থানীয় অ্যাসেম্বলিং শিল্পের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা প্রদান এবং খুচরা বাজারে কৃত্রিম সংকট রোধে তদারকি জোরদার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কার্যকর নীতিগত সহায়তা ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের এই অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক ফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা ও প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।