লাগাম টানা হচ্ছে হজ এজেন্সিগুলোর অনিয়মে

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পবিত্র হজে গিয়ে প্রতি বছরই কোনো না কোনোভাবে এজেন্সিগুলোর প্রতারণা ও অব্যবস্থাপনার শিকার হতে হয় সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের। চলতি ২০২৬ সালের হজ মৌসুমেও নানা ধরনের অনিয়ম, প্রতারণা, সৌদি সরকারের নির্দেশনা লঙ্ঘন এবং হজযাত্রীদের হয়রানির অভিযোগে অর্ধশতাধিক হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগে ১৭টি সংস্থাসহ একাধিক এজেন্সিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে, আগামী ২০২৭ সালের হজ ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ শৃঙ্খলায় আনতে এবং সৌদি আরবের অনলাইন ও কম্পিউটারাইজড সিস্টেমের সাথে খাপ খাওয়াতে চার মাস আগেই হজের নতুন রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে সরকার। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২০২৭ সালের হজ নিবন্ধন সম্পন্ন করার কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় অন্তত ১৬ দিন আগে। সময়মতো সিদ্ধান্ত ও আগাম নিবন্ধন নিশ্চিত করতে না পারলে আগামী হজ মৌসুমে বাংলাদেশ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এরআগে, গত ২৬ মে অনুষ্ঠিত পবিত্র হজে বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৮ হাজার ৫০০ জন হাজি অংশ নেন, যার মধ্যে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন হজযাত্রী পাঠাতে মোট ৭৫৮টি এজেন্সি নিয়োজিত ছিল। কিন্তু প্রতি বছরের মতো এবারও কিছু এজেন্সির দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মানসিকতায় হাজিদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার অভিযুক্ত হজ এজেন্সির সংখ্যা অর্ধশতাধিক হতে পারে এবং সৌদি আরব থেকে আসা অভিযোগগুলো আগামী এক মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে প্রাক-নিবন্ধিত হজযাত্রীদের অন্য এজেন্সিতে স্থানান্তর, নিবন্ধন বাতিল এবং সময়মতো সৌদি আরবে পাঠাতে ব্যর্থ হওয়াসহ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে গ্রিন এভিয়েশন, এয়ার রয়্যাল অ্যাভিয়েশন, নর্দার্ন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, বাপারি এয়ার সার্ভিস ও এয়ার স্টেশন ইন্টারন্যাশনালের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। এছাড়া লাইসেন্স বাতিল হওয়ার পরও তিনটি এজেন্সির নামে প্রায় ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে। পরে মন্ত্রণালয় তাদের কাছ থেকে এই অর্থ উদ্ধার করে ভুক্তভোগী হাজিদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে পাঠায়। একইভাবে আনসারি ওভারসিজ, রিলেশন ট্রাভেলস এবং নর্দার্ন ট্যুরসের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করে ক্ষতিগ্রস্ত হাজিদের হজের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং ‘হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২১’ অনুযায়ী এসব এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল, স্থগিত বা জামানত বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া চলছে। এদিকে, চলতি বছর হজের অন্যতম বড় জালিয়াতি ধরা পড়েছে কোরবানির অর্থ নিয়ে। সৌদি সরকারের নির্ধারিত অনলাইন ‘নুসুক মাসার’ প্ল্যাটফর্মের বাইরে গিয়ে কিছু এজেন্সি হাজিদের কাছ থেকে টাকা নিয়েও কোরবানির কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। অনেকে আবার শুধু ছাগল কেনার ভুয়া রসিদ দেখিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করেছে, যা সৌদি নিয়মে সম্পূর্ণ অবৈধ। এই অভিযোগে প্রত্যাশা ট্রাভেলস, দৈফুর রহমান ট্রাভেলস, গ্লোবাল ট্রাভেলস, মিডিয়া ট্রাভেলস এবং দারুল ইমান ইন্টারন্যাশনালকে শোকজ করা হয়েছে। এই অনিয়ম বন্ধ করতে আগামী ২০২৭ সালের হজ নিবন্ধন প্রক্রিয়াতেই মৌলিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এবার নিবন্ধনের সময় সিস্টেমেই হাজিকে উল্লেখ করতে হবে তিনি কোন ধরনের হজ পালন করবেন, যার ফলে শুরুতেই নির্ধারণ করা যাবে কতজন হাজির কোরবানি বাধ্যতামূলক এবং সে অনুযায়ী নুসুক সিস্টেমের ই-ওয়ালেটের মাধ্যমে অর্থ সরাসরি সৌদি আরবে চলে যাবে। এছাড়া হাজিদের লাগেজ হারানো, নিম্নমানের খাবার এবং অনুমোদিত এয়ারলাইন্সের বাইরে টিকিট কাটার মতো অনিয়মের কারণে লাকি ট্রাভেলস ও খোয়াই এয়ার ট্রাভেলসের মতো এজেন্সির বিরুদ্ধে আগামী দুই বছরের জন্য কার্যক্রম স্থগিতসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনার স্বার্থে এবার নিষ্ক্রিয় ও ছোট এজেন্সিগুলোর ওপর কঠোর ফিল্টারিং আরোপ করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যোগ্য তালিকায় নাম থাকার পরও যারা বিগত ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর ৪০ জনের কম হজযাত্রী নিবন্ধন করেছে এবং চলতি ২০২৬ সালে একটিও নিবন্ধন করাতে পারেনি, সেসব এজেন্সিকে ২০২৭ সালের হজ কার্যক্রম থেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখা হবে। নীতিমালায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, প্রতিটি এজেন্সিকে ন্যূনতম একজন গাইড সমসংখ্যক অর্থাৎ ৪৬ জন হজযাত্রী নিবন্ধন করতেই হবে, অন্যথায় তাদের অন্য এজেন্সির সাথে সমন্বয় বা স্থানান্তর করতে হবে। এর ফলে আগামী বছরের হজের জন্য যোগ্য এজেন্সির সংখ্যা অনেক কমে আসবে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় এক ধরনের পেশাদারিত্ব ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। জানা গেছে, চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২০২৭ সালের ১৫ মে পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হবে। সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত সময়সূচির সাথে মিল রেখে ধর্ম মন্ত্রণালয় যে আগাম রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে, তা অনুযায়ী ১৫ জুলাই থেকে ২৪ ডেসেম্বরের মধ্যে সৌদি প্রান্তের খরচের অর্থ নুসুক প্ল্যাটফর্মের ই-ওয়ালেটে স্থানান্তর করতে হবে। এছাড়া এয়ারলাইন্সের সাথে চুক্তি ও নুসুক ডকুমেন্টেশনের কাজ আগামী ৮ নভেম্বরের মধ্যে শেষ করে ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে হজযাত্রী নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ শেষ করতে হবে। আগামী বছরের ২৮ জানুয়ারি থেকে হজ ভিসা ইস্যু শুরু হবে এবং ৮ এপ্রিল থেকে প্রথম হজ ফ্লাইট যাত্রা করবে। হজ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আয়াতুল ইসলাম জানান, সৌদি আরব এখন পুরো হজ ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ কম্পিউটারাইজড ও সেন্ট্রাল সিস্টেমের আওতায় নিয়ে এসেছে। তারা জুলাইয়ের মধ্যেই তাঁবু বুকিং ও আবাসন চূড়ান্ত করতে চায়, তাই আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দ্রুত ও বেশি সংখ্যক নিবন্ধন নিশ্চিত করা। অন্যদিকে হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)-এর মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার মনে করেন, সৌদির নতুন নীতিমালার সাথে খাপ খাওয়াতে হলে বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনায় মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত এবং গ্রামগঞ্জে এখনো অনেকেই মনে করেন শেষ সময়ে নিবন্ধন করলেও হজে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু নতুন ডিজিটাল ও কম্পিউটারাইজড বাস্তবতায় এই ধরনের পুরোনো মানসিকতা আর কার্যকর হবে না।