শুল্ক ঝড়ের মাঝে রপ্তানি, সুযোগ না অনিশ্চয়তা?

নিজস্ব প্রতিবেদক:

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত প্রতিশোধমূলক শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করার পর বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যদিও ওই রায়ে আগের শুল্ক কাঠামো কার্যত বাতিল হয়, পরে ট্রাম্প নির্বাহী আদেশে সব দেশের ওপর ১৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক পুনর্বহাল করেন। ফলে সামগ্রিক চিত্র এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য যেমন ঝুঁকি তৈরি করেছে, তেমনি আলোচনার সুযোগও সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার। নতুন শুল্ক কাঠামো তাই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকেরা।

 

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মাশরুর রিয়াজ বলেন, আদালতের রায়ের পর আগের প্রতিশোধমূলক শুল্ক কার্যত বাতিল হয়। কিন্তু নির্বাহী আদেশে নতুন করে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ পরিস্থিতিকে আবারও অনিশ্চিত করেছে। তার ভাষায়, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে না দিয়ে, যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে পুনরায় আলোচনা করা উচিত।” ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন করা সহজ নয় বলেও তিনি মনে করেন।

 

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, আদালতের রায় বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। তার মতে, “যদি কিছু শুল্ক ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়, তা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হবে। আর না হলে নীতিনির্ধারকদেরই উদ্যোগ নিয়ে সেগুলো পর্যালোচনা করতে হবে।”

 

বাংলাদেশ গার্মেন্ট প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, বৈশ্বিকভাবে একই হারে শুল্ক আরোপের ফলে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবধান কিছুটা কমেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ঘনঘন পরিবর্তনের কারণে মার্কিন আমদানিকারকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এতে নতুন অর্ডার ও মূল্য নির্ধারণে সতর্কতা দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বদলে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির প্রবণতা বাড়তে পারে, যা উৎপাদন পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলবে।

 

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানান, আদালতের রায়ের পর প্রতিশোধমূলক শুল্ক কাঠামোতে সব দেশ কার্যত একই অবস্থানে এসেছে। তবে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভবিষ্যৎ এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে নেওয়া উদ্যোগও ইতিবাচক ফল দিতে পারে।

 

এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় সব দেশের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে বৈশ্বিক বাণিজ্যে সংকট তৈরি করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপিত হয়। পরবর্তী আলোচনায় তা কমিয়ে ৩৪ দশমিক ১ শতাংশে আনা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার না করা পণ্যে সেই হার বহাল থাকে।

 

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাক্ষরিত চুক্তি নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে বেশ কিছু সুবিধা নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ খুব বেশি লাভ পায়নি। চুক্তি বাতিল বা পুনর্বিবেচনা না হলে ক্ষতির ঝুঁকি থাকবে।” তিনি নতুন সরকারকে দ্রুত আলোচনায় বসার আহ্বান জানান।

 

আরেকটি বড় প্রশ্ন ১৩৩ বিলিয়ন ডলার শুল্ক আদায়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে। এই অর্থের বড় অংশ ভোক্তাদের ওপর চাপানো হয়েছে। ফেরতের বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক আশ্বাস থাকলেও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এখনো পরিষ্কার নয়।

 

বাংলাদেশ প্রতিবছর ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে। আমদানি তুলনামূলক কম। এই বাণিজ্য ঘাটতিকেই অতিরিক্ত শুল্কের কারণ হিসেবে দেখিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিমান ও কৃষিপণ্য আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দেয়। তবে অনেক অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মনে করেন, সেই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের লাভ বেশি হয়েছে।

 

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনো পরিবর্তনশীল। উদ্যোক্তাদের মতে, স্থিতিশীলতা ফিরলে প্রকৃত প্রভাব বোঝা যাবে। ততদিন কৌশলী ও সতর্ক পদক্ষেপই হতে পারে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ।