শেখ হাসিনা-রেহানাসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

৪১টি তফসিলি ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর ফান্ড থেকে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’-এর নামে ২৭৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ ও আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক সভাপতি ও এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

 

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মো. ইসমাইল হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি করেন। পরে দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান সাংবাদিকদের বিষয়টি জানান।

 

দুদকের অভিযোগ, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে ৪১টি ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড থেকে ওই অর্থ সংগ্রহ করেন। এতে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা প্রযোজ্য করা হয়েছে।

 

যেভাবে ব্যাংকগুলোর অর্থ নেওয়ার অভিযোগ

 

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ১৯৯৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’ গঠিত হয়। ট্রাস্টের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী শেখ হাসিনা আজীবন সভাপতি এবং তার অনুপস্থিতিতে শেখ রেহানা সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

 

দুদকের অনুসন্ধানে ৪১টি ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্য ও নথি পর্যালোচনার কথা এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিএবির সভাপতি থাকাকালে মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার নির্বাহী কমিটির সভার আলোচ্যসূচিতে না থাকা সত্ত্বেও ‘বিবিধ’ আলোচনার মাধ্যমে ট্রাস্টকে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ফান্ড থেকে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি উপস্থাপন করেন।

 

পরে বিএবির নির্বাহী কমিটির বিভিন্ন সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বিভিন্ন ব্যাংকে ট্রাস্টের অনুকূলে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠানো হয়।

 

এরপর ৪১টি ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড থেকে মোট ২৭৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয় বলে দুদকের এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম মজুমদার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রভাব কাজে লাগিয়ে ব্যাংকগুলোকে ট্রাস্টে সিএসআর ফান্ডের অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেন। এ অর্থ ট্রাস্টে দেওয়ার বিধান না থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যাংকগুলোকে অর্থ দিতে বাধ্য করার অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।

 

সিএসআর অর্থ দেওয়ার বিধান নেই, দাবি দুদকের

 

দুদকের এজাহারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর-সংক্রান্ত নির্দেশনার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের সিএসআর-সংক্রান্ত নির্দেশনা এবং ২০২২ সালের ‘পলিসি গাইডলাইনস অন করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি ফর ব্যাংকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস’-এ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সিএসআর অর্থ ব্যয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

তবে ওই নির্দেশনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টে সিএসআর ফান্ডের অর্থ দেওয়ার কোনো বিধান নেই বলে দুদকের অভিযোগ।

 

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, দুদকের সরেজমিন পরিদর্শনে ট্রাস্টের ঠিকানায় দাপ্তরিক কার্যক্রমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে ট্রাস্টটির সমাজসেবা অধিদপ্তর ও এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর অনুমোদন নেই বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

 

দুদকের অভিযোগ, ট্রাস্টের নামে সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনার কথা থাকলেও অনুসন্ধানে সেই প্রতিশ্রুত কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এরপরও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে সিএসআর ফান্ডের অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

 

তিন আসামির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ

 

শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ট্রাস্টটির সঙ্গে নেতৃত্বের পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। দুদকের অভিযোগ, ব্যক্তিগত লাভের অসৎ উদ্দেশ্যে ট্রাস্টের নামে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ফান্ড থেকে অর্থ সংগ্রহে তারা ভূমিকা রাখেন।

 

অন্যদিকে নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিএবির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ট্রাস্টে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি নির্বাহী কমিটির সভায় উপস্থাপন করেন এবং পরবর্তী সময়ে ৪১টি ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখেন।

 

দুদক বলছে, আসামিরা পারস্পরিক যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ফান্ড থেকে অর্থ গ্রহণ করে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি করেছেন।

 

এ ঘটনায় তদন্তের সময় অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

এর আগেও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

 

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।

 

এরই ধারাবাহিকতায় ক্ষমতার অপব্যবহার ও জালিয়াতির মাধ্যমে রাজউকের আবাসন প্রকল্পে ১০ কাঠা করে মোট ৬০ কাঠার প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা করেছে সংস্থাটি।