নিজস্ব প্রতিবেদক:
স্বামী তৌফিক নওয়াজের শেষকৃত্যে অংশ নিতে ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়েছেন কারাবন্দি সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তায় তাকে বের করে ঢাকার উদ্দেশে নেওয়া হয়। সকাল ৯টার দিকে তিনি কলাবাগানের নিজ বাসায় পৌঁছান।
মুন্সীগঞ্জের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা নুরমহল আশরাফীর আদেশ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দীপু মনির প্যারোল কার্যকর থাকবে। এ সময় তিনি প্রয়াত স্বামীর মরদেহ দেখতে এবং দাফন কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাকে আবার কারাগারে ফিরে যেতে হবে।
মুন্সীগঞ্জ কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার মো. হাসেম রেজা জানান, বুধবার সন্ধ্যার দিকে দীপু মনিকে ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তির নির্দেশনার কাগজ পাওয়া যায়। এরপর কারাগারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। তার নিরাপত্তায় পুলিশের দুটি গাড়ি ও একটি প্রিজন ভ্যানে মোট ৩৮ জন পুলিশ সদস্য ছিলেন।
এর আগে বুধবার দীপু মনির মেয়ে তানী দীপাবলী নওয়াজ এবং তার আইনজীবী গাজী ফয়সাল ইসলাম প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান। আইনজীবী জানান, তারা চার দিনের প্যারোল চেয়ে আবেদন করেছিলেন। পরে জেলা প্রশাসন ১২ ঘণ্টার প্যারোল মঞ্জুর করে।
দীপু মনি কলাবাগানের বাসায় পৌঁছানোর পর সেখানে পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। কলাবাগান থানার ওসি ফজলে আশিক বলেন, “দীপু মনি কলাবাগানের বাসাতেই আছেন। আমরা পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি।”
এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে তৌফিক নওয়াজের মরদেহ কলাবাগানের বাসায় নেওয়া হয়। বাসার নিচের গ্যারেজে ফ্রিজিং ভ্যানে মরদেহ রাখা হয়। সেখানে বশির উদ্দিন রোড মসজিদের মুয়াজ্জিনসহ পাঁচজনকে ফ্রিজিং ভ্যানের পাশে কাপড় পেতে কোরআন তেলাওয়াত করতে দেখা যায়।
বাড়িটিকে ঘিরে পুলিশকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়। সেখানে যাওয়া ব্যক্তিদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল। বেলা ১১টার কিছু আগে চাঁদপুর থেকে আসা দীপু মনির এক আত্মীয়ের সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নারী জানান, দীপু মনি খুব ভেঙে পড়েছেন। মানসিকভাবে তিনি বিপর্যস্ত এবং কিছু খেতে চাইছেন না।
পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দুপুরে তৌফিক নওয়াজের মরদেহ গুলশানের আজাদ মসজিদে নেওয়া হবে। বাদ জোহর সেখানে জানাজা ও দোয়া শেষে তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করার প্রস্তুতি রয়েছে। বশির উদ্দিন রোড মসজিদের এক খাদেম জানান, দুপুর ১২টার দিকে মরদেহ নিয়ে ফ্রিজার ভ্যানটি গুলশান আজাদ মসজিদের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা।
তৌফিক নওয়াজ মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাতে রাজধানীর গুলশানের কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিডনি ও লিভারের বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন। চিকিৎসাসহ তার দেখভালের দায়িত্বে থাকা আপেল খকশি এ তথ্য জানিয়েছেন। মৃত্যুর সময় ছিল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী তৌফিক নওয়াজ ধ্রুপদি সংগীতেরও চর্চা করতেন। ২০১৯ সালে তিনি স্ট্রোক করেছিলেন। সর্বশেষ গত ২৭ মে স্বজনেরা তাকে হুইলচেয়ারে করে আদালতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি কারাবন্দি স্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে দেখা করেন।
তৌফিক নওয়াজের শারীরিক অবস্থার অবনতির সময় তাকে প্যারোলে মুক্তির জন্য আগেও আবেদন করা হয়েছিল। ২৭ মে তার অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে দীপু মনিকে সাত দিনের প্যারোলে মুক্তির আবেদন করেছিলেন তাদের মেয়ে তানী দীপাবলী নওয়াজ। তবে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসন তখন ওই আবেদনে সাড়া দেয়নি।
এরপর তৌফিক নওয়াজের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে রাজধানীর গুলশানের কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একাধিক মামলার আসামি হয়ে দীপু মনি মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে বন্দি রয়েছেন। হাই কোর্টে কয়েকটি মামলায় জামিন পেলেও আরও মামলায় তার নাম থাকায় তিনি মুক্তি পাননি। ঢাকা ও মুন্সীগঞ্জ মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।
দীপু মনিকে এর আগে ২০২৪ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারের বাইরে স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়েও তিনি একাধিকবার অনুমতি পাননি। আদালতে হাজির করার সময় শয্যাশায়ী তৌফিক নওয়াজকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে আসতেন স্বজনেরা, যাতে তিনি কারাবন্দি স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পারেন।
স্বামীর দাফন শেষে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে দীপু মনিকে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে ফিরে যেতে হবে।











