হাওরে বর্ষার জল না থাকায় বিক্রি কমে গেছে ঐতিহ্যবাহী নৌকা

জেলা প্রতিনিধি :

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের মানুষ এখন বলছেন, ‘বর্ষায় নাও, শুকনায় পাও’—এই প্রবাদ এ বছর যেন ফিকে হয়ে গেছে। কারণ বর্ষা এলেও হাওরে এখনো আসেনি পর্যাপ্ত পানি। ফলে শান্তিগঞ্জ উপজেলার দরগাপাশা ইউনিয়নের আক্তাপাড়া নৌকার হাটে নেমে এসেছে ক্রেতাশূন্যতা।

প্রায় ৩৫ বছর ধরে চলে আসা এই হাট বসে প্রতি শুক্রবার। বর্ষা মৌসুমে হাওরের যোগাযোগ ও কৃষিকাজের অন্যতম বাহন হিসেবে বজরা, হিল্লা, পাতামী, বারকীসহ নানা ধরনের নৌকা কেনাবেচা হয় এখানে। কিন্তু এবার বর্ষা মৌসুম শুরু হলেও পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় খাল-বিল পানিশূন্য, আর সেইসঙ্গে জমেনি হাট।

হাটজুড়ে সাজানো আছে ৩–৪ শতাধিক নৌকা, কিন্তু হাতেগোনা কয়েকজন ক্রেতা। প্রতি মৌসুমে যেখানে গড়ে ১২০০ নৌকা বিক্রি হতো, এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ৪০০টিতে। প্রতি সপ্তাহে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০টি নৌকা।

বিক্রেতারা বলছেন, নৌকা তৈরির খরচ বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। ৯ হাজার টাকায় বানানো নৌকা এখন ১৫ হাজার টাকায় পড়ে যাচ্ছে। ফলে বারকী নৌকা বিক্রি হচ্ছে ২০–২২ হাজার, পাতামী ১৩–১৫ হাজার এবং খিল্লা নৌকা ৫–৭ হাজার টাকায়। তবুও উচ্চমূল্যের কারণে মানুষ কিনছে না।

আজমিরীগঞ্জ থেকে আসা বৈঠা ব্যবসায়ী বাছির মিয়া জানান, আগে প্রতি হাটে বিক্রি হতো ১২০০টির মতো বৈঠা, এখন তা নেমে এসেছে ২০০–৩০০-তে। দাম বেড়ে ৬ হাতের বৈঠা এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০০–৬৫০ টাকায়।

নৌকা ব্যবসায়ী জুয়েল মিয়া বলেন, “ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ৭০টা নৌকা বানিয়েছি, কিন্তু বিক্রি হয়েছে মাত্র ৪০টা। লাভ তো দূরে থাক, ঋণ শোধ করাই এখন চিন্তার বিষয়।”

ক্রেতারাও অসন্তুষ্ট। বরকাপন গ্রামের আজমান আলী ও রনশী গ্রামের আখলিস আলী জানান, পানি না থাকায় কাজ হচ্ছে না, ফলে নৌকার দরকারও নেই। তার ওপর দাম বেশি, তাই কিনতে পারছেন না।

হাটের ইজারাদার মুরাদ চৌধুরী ও সামছুদ্দিন সুনু বলেন, “ভালো মৌসুমে অন্তত ৫টি শুক্রবার বিক্রি ভালো হলে লাভ হয়। কিন্তু এ বছর একমাত্র এক হাট ছাড়া বাকি সব হাটেই লোকসান।”

শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুকান্ত সাহা বলেন, “এই ঐতিহ্যবাহী হাট রক্ষায় বাজারে সোলার লাইট ও সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে বৃষ্টির অভাব আমাদের নিয়ন্ত্রণে নয়। আশা করছি, কিছুদিনের মধ্যেই বৃষ্টি হবে এবং হাট আবার জমে উঠবে।”

এখন হাওরবাসী ও ব্যবসায়ীরা তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে। বর্ষা পুরোপুরি এলে পানির সাথে ফিরবে নৌকার চাহিদা, জমবে হাট—এটাই তাদের আশা।