৯ ঘণ্টায় ২৮ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ওপরে তিস্তার পানি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে আবারও বেড়েছে তিস্তা নদীর পানি। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ডালিয়া পয়েন্টে বুধবার (৫ আগস্ট) সকাল ৯টায় পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর আগে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টায় বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচে থাকা পানি মাত্র ৯ ঘণ্টায় ২৮ সেন্টিমিটার বেড়ে এই অবস্থায় পৌঁছায়।

 

পানি বাড়ায় তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে নতুন করে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী ও গয়াবাড়ী ইউনিয়নের বিভিন্ন নিচু এলাকায় এরই মধ্যে পানি প্রবেশ করেছে। একই সঙ্গে জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ী ও শৌলমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলেও প্লাবনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৬টা ও ৯টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি সমতল ছিল ৫২ দশমিক ২৮ মিটার। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। অর্থাৎ পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

 

এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় পানি ছিল ৫২ মিটার, যা বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচে। পানি পরিমাপকারী নুরুল ইসলাম জানান, এরপর মাত্র ৯ ঘণ্টায় পানির উচ্চতা ২৮ সেন্টিমিটার বেড়ে ৫২ দশমিক ২৮ মিটারে ওঠে।

 

গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা অববাহিকার ডালিয়া পয়েন্টে ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের অংশে টানা বৃষ্টির কারণেই তিস্তার পানি বেড়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। তার আশা, বুধবার সন্ধ্যার মধ্যে পানি আবার বিপৎসীমার নিচে নেমে আসতে পারে।

 

পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।

 

উজানের পরিস্থিতি সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া গেছে। ভারতের সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, তিস্তার উজানে ভারতের দো-মোহনী পয়েন্টে বুধবার সকাল ৯টায় পানি সেখানকার বিপৎসীমা ৮৫ দশমিক ৯৫ মিটারের ৩৯ সেন্টিমিটার নিচে, ৮৫ দশমিক ৫৬ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকায় ২২৩ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

 

বাংলাদেশের ডালিয়া ব্যারেজ থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে ভারতের মেখলিগঞ্জ পয়েন্টেও তিস্তার পানি বিপৎসীমার নিচে ছিল। সকাল ৯টায় সেখানে পানি ৬৫ দশমিক ১১ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল। ওই পয়েন্টের বিপৎসীমা ৬৫ দশমিক ৯৫ মিটার। সেখানে হলুদ সংকেত জারি করা হয়েছে এবং গত ২৪ ঘণ্টায় ১৬৭ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।

 

এদিকে রংপুরের কাউনিয়া পয়েন্টে বুধবার সকাল ৯টায় তিস্তার পানি ছিল ২৮ দশমিক ৯০ মিটার। সেখানে বিপৎসীমা ২৯ দশমিক ৩০ মিটার। অর্থাৎ পানি বিপৎসীমার ৪০ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে।

 

তিস্তার পানি বাড়ায় ডিমলা ও জলঢাকার নিচু এলাকাগুলো নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ডিমলার টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন বলেন, তিস্তার পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চলে ঢুকতে শুরু করেছে। পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে।

 

তবে এখন পর্যন্ত কোনো বাড়িঘরে পানি ঢোকার খবর পাওয়া যায়নি।

 

তিস্তার পানি বৃদ্ধির সঙ্গে নদীভাঙনের আশঙ্কাও রয়েছে। এর আগে ২২ জুলাই সকাল ৬টায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার মাত্র ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। এরপর পানি কমতে কমতে বিপৎসীমার ৫৭ সেন্টিমিটার নিচে, ৫১ দশমিক ৫৮ মিটারে নেমে যায়।

 

ওই সময় পানির চাপ বৃদ্ধি ও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে ডিমলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ছাতুনামা, কেল্লাপাড়া ও ভেন্ডাবাড়িসহ কয়েকটি এলাকায় তীব্র নদীভাঙন শুরু হয়। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব দিয়ে স্পার বাঁধ নির্মাণ শুরু করে।

 

আবারও পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় সেই সদ্য নির্মিত স্পার বাঁধের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কেল্লাপাড়া গ্রামের ৬০ বছর বয়সী রশিদুল ইসলাম বলেন, ২২ জুলাইয়ের ভাঙনে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নিরাপদ জায়গায় চলে যায়। পানি কমার পরও অনেকে নিজেদের জায়গায় ফিরতে পারেননি। নতুন করে পানি বাড়ায় স্পার বাঁধ নিয়ে তাদের উদ্বেগ বেড়েছে।

 

ছানাতামা গ্রামের আব্দুল জলিল বলেন, তিস্তার পানি বাড়ার সঙ্গে তীব্র স্রোতে বানের পানি নিম্নাঞ্চলে ঢুকছে। এতে নতুন করে শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

অন্যদিকে লালমনিরহাটের তিস্তা ব্যারেজ এলাকাতেও পানি বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। জেলার ধরলা নদীর পানিও বাড়ছে। তবে ধরলা নদীর শিমুলবাড়ী পয়েন্টে বুধবার পানি ছিল ২৯ দশমিক ৪৬ মিটার, যেখানে বিপৎসীমা ৩০ দশমিক ৮৭ মিটার। অর্থাৎ পানি এখনো বিপৎসীমার ১ দশমিক ৪১ মিটার নিচে রয়েছে।

 

লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার জানিয়েছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপর বা কাছাকাছি স্থিতিশীল থাকতে পারে। এরপর পানি ভাটির দিকে নামতে থাকলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা নেই।