উত্তরে বাঁশ শিল্প হারিয়ে যাওয়ায় টিকে থাকতে হিমশিম শিল্পীরা

জেলা প্রতিনিধি :

এক সময় উত্তরের ৮ জেলার ১১৪টি গ্রামের প্রাণ ছিল বাঁশ শিল্প। সেই শিল্প এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। আধুনিকতা আর ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে টিকে থাকতে না পেরে শত বছরের এই ঐতিহ্য মুখ থুবড়ে পড়েছে।

রংপুর বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আবু জাফর জানান, এক সময় প্রায় ৭০ হাজার পরিবার বাঁশ শিল্পে কর্মরত থাকলেও বর্তমানে এই সংখ্যাটি নেমে এসেছে মাত্র ১২ হাজারে। একদিকে বাঁশের ঘাটতি, অন্যদিকে বিক্রির বাজার সংকোচনের কারণে শিল্পীরা বাধ্য হচ্ছেন পেশা পরিবর্তনে।

রংপুরের গঙ্গাচড়ার মনিরাম গ্রাম ছিল এক সময়ের বাঁশশিল্পের প্রাণকেন্দ্র। গ্রামের প্রবীণ শিল্পী আবদুল ওয়াহেদ (৮৫) বলেন, “বাবার হাত ধরে এই কাজ শুরু করেছিলাম। আগে সংসার চালাতে কোনো কষ্ট হতো না, এখন পুরো দিন কাজ করেও তেমন লাভ হয় না।”

বর্তমানে একটি বাঁশের দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, যা দিয়ে তৈরি মুরগির টোপা বিক্রি হয় মাত্র ১০০ টাকা দরে। ফলে লাভ তো দূরে থাক, পুঁজি ফিরে পাওয়াও দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাঁশশিল্পী মোমেনা জানান, টিকে থাকতে দাদন ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। ৫ হাজার টাকা ঋণ নিলে মাসে ৫০০ টাকা সুদ দিতে হয়, যা অনেকের জন্যই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাঁশশিল্পী দুলালী বলেন, “ঋণ চাইলে কেউ দেয় না। সরকার থেকেও কোনো সহায়তা পাইনি। কাজটা ধরে রাখতে চাই, কিন্তু পুঁজি নেই, বাজার নেই।”

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, “বাঁশ শিল্প কেবল একটি পেশা নয়, এটি গ্রামীণ জীবনের অংশ। প্রশিক্ষণ, আধুনিক ডিজাইন ও অনলাইন বিপণন প্ল্যাটফর্ম যুক্ত করা গেলে এটি আবারও টেকসই শিল্পে রূপ নিতে পারে।”

বিসিকের রংপুর উপ-মহাব্যবস্থাপক এহসানুল হক বলেন, “উপজেলাপর্যায়ে বিসিক অফিস না থাকায় সরাসরি যোগাযোগ নেই। তবে কেউ যোগাযোগ করলে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে।”

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একটু পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ ও বাজার সম্প্রসারণ উদ্যোগ নিলে এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য আবারও ফিরে আসতে পারে।