ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবেলার চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা শুরু

অনলাইন ডেস্ক:

ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবেলায় একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত এক সপ্তাহের আলোচনা সোমবার জেনেভায় শুরু হয়েছে। তবে গভীর মতপার্থক্যের কারণে এখনো সমঝোতা অধরাই রয়ে গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তত্ত্বাবধানে চলা এ আলোচনায় ধনী দেশ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে গত বছর গৃহীত মহামারি চুক্তিটি বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।

চুক্তির ‘প্যাথোজেন অ্যাকসেস অ্যান্ড বেনিফিট-শেয়ারিং’ (পিএবিএস) ব্যবস্থা সম্ভাব্য মহামারি সৃষ্টিকারী জীবাণুর তথ্য ভাগাভাগি এবং সেগুলো থেকে উদ্ভূত টিকা, পরীক্ষা ও চিকিৎসার মতো সুবিধা ভাগাভাগির বিষয়টি নিয়ে কাজ করে।

 

জেনেভা থেকে এএফপি জানায়, আলোচনার শুরুতে ডব্লিউএইচও প্রধান তেদ্রোস আধানোম গেব্রিয়েসুস বলেন, ‘বিশ্ব এই সুযোগ হারানোর ঝুঁকি নিতে পারে না এবং পরবর্তী মহামারির জন্য অপ্রস্তুত থাকার সামর্থ্যও আমাদের নেই।’

 

তিনি আলোচকদের বলেন, ‘এটি নিখুঁত হবে না; কোনো চুক্তিই নিখুঁত হয় না। তবে এটি ন্যায়সঙ্গত হতে পারে, কার্যকর হতে পারে।’

 

২০২৫ সালের মে মাসে কোভিড-১৯ মহামারির অভিঘাত থেকে শিক্ষা নিয়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা আলোচনার পর ডব্লিউএইচও সদস্য রাষ্ট্রগুলো ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় একটি ঐতিহাসিক চুক্তি গ্রহণ করে।

 

চুক্তিটির লক্ষ্য ছিল করোনাভাইরাস সংকটের সময়কার বিচ্ছিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো এবং বৈশ্বিক সমন্বয়, নজরদারি ও টিকার প্রাপ্যতা বাড়ানো।

 

তবে চুক্তির মূল অংশ হিসেবে বিবেচিত পিএবিএস ব্যবস্থাটি তখন বাদ রাখা হয়েছিল, যাতে মূল চুক্তিটি দ্রুত অনুমোদন পায়।

 

‘দায় সবার’

 

ডব্লিউএইচও’র প্রধান বিজ্ঞানী সিলভি ব্রিয়ান্দ এএফপিকে বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের অবিশ্বাসের কথা জানাচ্ছে। তারা আশঙ্কা করছে, সংকটের সময় টিকার ন্যায্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা ছাড়া তারা ভাইরাসের তথ্য ভাগ করবে।’

 

তিনি বলেন, অন্যদিকে কিছু দেশ প্রশ্ন তুলছে, বিনিয়োগের প্রত্যাবর্তনের নিশ্চয়তা ছাড়া ওষুধ শিল্পের পক্ষে মহামারি চুক্তিতে অবদান রাখা সম্ভব বা উৎসাহজনক হবে কি না।

 

আগামী ১৮ মে শুরু হতে যাওয়া ডব্লিউএইচও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে যাতে এটি অনুমোদন পায়, সে জন্য শুক্রবারের মধ্যে দেশগুলোকে পিএবিএস নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।

 

জেনেভায় ব্রাজিল মিশনের কূটনীতিক জ্যঁ কারিদাকিস বলেন, ‘অগ্রগতি ধীরগতির’ এবং সমঝোতা খুঁজে পাওয়া ‘খুব কঠিন’ হবে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন ‘কিছুটা নমনীয়তা দেখানোর চেষ্টা করছে’।

 

রোগজীবাণু ভাগাভাগির ধারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে, বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলোর কাছে। কোভিড-১৯ টিকার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় তারা নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করেছিল।

 

যদিও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ধনী দেশগুলোর অনমনীয় অবস্থানের সমালোচনা করেছে, তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, ‘কিছু উন্নয়নশীল দেশের পক্ষ থেকেও অতিরিক্ত দাবি রয়েছে’। ফলে অচলাবস্থার জন্য ‘দায় সবারই’।

 

গোপনীয় প্রবেশাধিকার

 

চুক্তিতে ইতোমধ্যে বলা হয়েছে, অংশগ্রহণকারী ওষুধ কোম্পানিগুলোকে তাদের উৎপাদিত টিকা, পরীক্ষা ও চিকিৎসাসামগ্রীর ২০ শতাংশ ডব্লিউএইচও’র কাছে পুনর্বণ্টনের জন্য দিতে হবে—যার অন্তত অর্ধেক হবে অনুদান হিসেবে এবং বাকিটা ‘সাশ্রয়ী মূল্যে’।

 

তবে এর শর্তাবলি এখনো নির্ধারিত হয়নি। একইভাবে মহামারির বাইরের সময় স্বাস্থ্য তথ্য ও সরঞ্জামে প্রবেশাধিকার নিয়েও সিদ্ধান্ত হয়নি।

 

বেসরকারি সংস্থা ও উন্নয়নশীল দেশগুলো চায়, গবেষণাগারগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক নিয়ম করা হোক, যাতে দরিদ্র দেশগুলো টিকার ন্যায্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারে।

 

চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্সের (এমএসএফ) ওলেনা জারিৎসকা বলেন, ‘ইবোলা প্রাদুর্ভাবের সময় আফ্রিকান রোগীদের নমুনা থেকে চিকিৎসা উদ্ভাবিত হয়েছিল, কিন্তু এমন বাধ্যবাধকতা ছিল না।’

 

তার ভাষায়, এর ফল ছিল আফ্রিকায় সীমিত সরবরাহ, আর যুক্তরাষ্ট্রে মজুত গড়ে ওঠা। বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ডব্লিউএইচও থেকে সরে গেছে।

 

উন্নয়নশীল দেশগুলো পিএবিএস ডেটাবেজে ব্যবহারকারী নিবন্ধন ও নজরদারি ব্যবস্থা চায়। তবে উন্নত দেশগুলো—‘মূলত জার্মানি, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড’ গোপনীয় প্রবেশাধিকার বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলে জানান থার্ড ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্কের জ্যেষ্ঠ গবেষক কে. এম. গোপাকুমার।

 

তিনি বলেন, গোপনীয় প্রবেশাধিকার থাকলে কে জীবাণুর তথ্য ব্যবহার করছে এবং তারা সুবিধা ভাগাভাগি করছে কি না, তা অনুসরণ করা ‘অসম্ভব’ হয়ে পড়বে।

 

অক্সফামসহ ১০০টি বেসরকারি সংস্থা ডব্লিউএইচও’র কাছে পাঠানো এক যৌথ চিঠিতে বলেছে, ‘বাস্তবে এর অর্থ হলো, উন্নয়নশীল দেশ থেকে আসা জেনেটিক সম্পদ সম্পূর্ণ দায়মুক্তির সঙ্গে ব্যবহার, বাণিজ্যিকীকরণ ও শোষণ করা সম্ভব হবে।’