ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিরোধ না করলে দেশ এখনও পাকিস্তান থাকত: স্পিকার হাফিজ উদ্দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু না করলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না, বরং দেশ এখনও পাকিস্তানের অংশ হিসেবেই থেকে যেত বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল গোটা বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

 

শনিবার (১১ জুলাই) ঢাকার মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন সেন্টারে রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া) আয়োজিত ‘দি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

 

স্পিকার বলেন, “ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট যদি ১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু না করত, তাহলে এই দেশ এখনো পাকিস্তান থাকত।” তিনি বলেন, সে সময় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মাত্র পাঁচটি ব্যাটালিয়ন ছিল। তারা আলাদাভাবে বিদ্রোহ করে জনগণকে সংগঠিত করে এবং মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি গড়ে তোলে।

 

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রসঙ্গে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, এটি কোনো দলের যুদ্ধ নয়, বরং একটি জাতির যুদ্ধ। তার ভাষায়, “১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ। একটি জাতির যুদ্ধ।” তিনি অভিযোগ করেন, স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক কারণে মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধরত বাহিনী ও যোদ্ধাদের অবদান যথাযথভাবে ইতিহাসে স্থান পায়নি।

 

আলোচনায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও বক্তব্য দেন স্পিকার। তিনি বলেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দীন আহমদ শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানি বাহিনীর সম্ভাব্য হামলার আগে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তবে শেখ মুজিবুর রহমান বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে চাননি এবং পাকিস্তান ভাঙার দায় নিজের ওপর নিতে রাজি ছিলেন না বলে স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি।

 

হাফিজ উদ্দিনের ভাষ্য, পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হওয়ার পর জনগণের জীবন ও সম্ভ্রম রক্ষায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিরোধ গড়ে তোলে। “এই সময় স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন মেজর জিয়াউর রহমান। এটি হলো প্রকৃত সত্য। যে ঘোষণায় জাতি উদ্দীপ্ত হয়েছে, অনুপ্রাণিত হয়েছে। হাজার হাজার ছাত্র-যুবক ঘরবাড়ি ছেড়ে যুদ্ধে অংশ নিতে এগিয়ে এসেছে।”

 

নিজের সেনাজীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে স্পিকার জানান, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তার ছিল না। পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড় থাকার সময় ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন সেক্রেটারি মেজর মোহাম্মদ মালিক তাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে উৎসাহিত করেন। পরে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি কাকুলে প্রশিক্ষণের সময় তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে পরিচয় হয় এবং তার অনুপ্রেরণায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

 

তিনি বলেন, “আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি স্বাধীনতার মহান ঘোষক, এ দেশের মহান রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে, যিনি আমাকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদানের জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। তার কথাতেই আমি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দিয়েছি।”

 

মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বাস্তবতা তুলে ধরে হাফিজ উদ্দিন বলেন, পাকিস্তানি বাহিনী কোনো সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নয়, পুরো বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। আর এ কারণেই তাদের পরাজয় অনিবার্য হয়ে ওঠে।

 

তিনি আরও বলেন, আজও রাস্তায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কোনো সৈনিককে দেখলে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। “কিসের স্পিকার, কিসের প্রধানমন্ত্রী, কিসের রাষ্ট্রপতি। নাথিং লাইক ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। নাথিং লাইক বিইং এ সোলজার। এটা হলো আমার অনুভূতি।”

 

বক্তব্যে একাত্তরের যুদ্ধের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন স্পিকার। তিনি দাবি করেন, মুক্তিবাহিনী একক প্রচেষ্টায় সিলেট জেলা শহর দখল করেছিল এবং ১৫ ডিসেম্বর এমসি কলেজ এলাকায় সংঘটিত যুদ্ধে তিনি দুটি কোম্পানির নেতৃত্ব দেন। ওই যুদ্ধে তার কোম্পানির আটজন সদস্য শহীদ হন বলেও জানান তিনি।

 

অনুষ্ঠানের শেষদিকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান স্মরণ করে স্পিকার উপস্থিত সবার উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন, “ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বাংলাদেশের স্বাধীনতায় গৌরবময় অবদান রেখেছে, এ কথাটি আপনারা কি স্বীকার করেন?” উপস্থিত অতিথিদের সম্মতিসূচক সাড়া পাওয়ার পর তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে।”