নিজস্ব প্রতিবেদক:
নেত্রকোনার সদর উপজেলায় ১৪ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিপন মিয়ার বিরুদ্ধে। অভিযোগটি থানায় নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় না গিয়ে স্থানীয় বিএনপির একটি কার্যালয়ে সালিসের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। সেখানে রিপনকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা এবং এলাকাছাড়া করার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সালিসের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। পরে পুলিশ ঘটনাটি তদন্তে মাঠে নামে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, গত শনিবার রাত ৮টার দিকে রিপন তাদের বাড়িতে যান। তখন ১৪ বছর বয়সী ওই স্কুলছাত্রী বাড়ির উঠানে রান্না করছিল। তার বাবা স্থানীয় বাজারে চায়ের দোকানে এবং মা বাইরে কাজে ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, এই সুযোগে রিপন মেয়েটিকে জোর করে বাড়ির পাশের একটি জঙ্গলে নিয়ে যান এবং ধর্ষণ করেন। পরে মেয়েটির চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে রিপন সেখান থেকে পালিয়ে যান।
পরিবারের আরও অভিযোগ, ভিডিও বানানোর কথা বলে রিপন আগে থেকেই ওই কিশোরীকে উত্ত্যক্ত করতেন। তবে লোকলজ্জার ভয়ে তারা প্রথমে বিষয়টি কাউকে জানাননি। পরে ঘটনাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে সোমবার (৩ আগস্ট) রাতে নেত্রকোনা সদর উপজেলার একটি স্থানীয় বাজারে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে সালিস বসানো হয়।
সালিসে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় বিএনপি, জামায়াতের নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বৈঠকটি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয় বলে জানা গেছে। সেখানে রিপন অভিযোগ স্বীকার করে ক্ষমা চান বলে সালিসে উপস্থিত এক ব্যক্তি জানিয়েছেন।
সালিসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রিপনকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা এবং এলাকাছাড়া করার কথা বলা হয়। বৈঠকের পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকালে ছড়িয়ে পড়া প্রায় ৩০ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে রিপনকে অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে ও উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে ক্ষমা চাইতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তিনি ভুল করার কথা স্বীকার করে ক্ষমা চান। পরে ফজলুর রহমানের পায়ে ধরেও তাকে ক্ষমা চাইতে দেখা যায়।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। ধর্ষণের মতো গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ কোনো স্থানীয় সালিস বা দলীয় কার্যালয়ে বসে মীমাংসার চেষ্টা করা আইনসঙ্গত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অনেকে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক (উত্তরাঞ্চল) প্রীতম সোহাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ধর্ষণের মতো অভিযোগের বিচার আইন অনুযায়ী পুলিশ ও আদালতের মাধ্যমে হওয়া উচিত। দলীয় কার্যালয়ে বসে এ ধরনের ফৌজদারি অপরাধের বিচার করার চেষ্টা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার শামিল এবং এটি নিন্দনীয়।
তবে সালিসে উপস্থিত স্থানীয় বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমানের বক্তব্য, মেয়েটির পরিবার দরিদ্র এবং মামলা চালানোর সামর্থ্য তাদের নেই। মঙ্গলবার বিকেলে তিনি বলেন, বিষয়টি জানার পর মেয়েটির পরিবার ও গ্রামের লোকজন তাদের কাছে বিচার নিয়ে আসেন। পরে এলাকাবাসী মিলে সালিসে বসেন এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
ফজলুর রহমান বলেন, সালিসের মাধ্যমে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে পুলিশ ঘটনাটি জানার পর তাদের সঙ্গে কথা বলছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের জানান, অভিযোগ দেওয়ার জন্য মেয়েটিকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থানায় পাঠানো হয়েছে। সালিসে উপস্থিত দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অভিযুক্ত রিপনকেও আটকের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে রিপন মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে আছেন বলে জানা গেছে।











