গণভবনে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের দুয়ার খুলল, উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক:

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে গড়ে তোলা জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে। বুধবার (৫ আগস্ট) সকাল ৯টায় জাদুঘরের স্মৃতিফলক উন্মোচনের মাধ্যমে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনের পর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়ে জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি ও প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন তিনি।

 

স্মৃতিফলক উন্মোচনের পর সুরা ফাতিহা পাঠ, দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী জাদুঘরে সংরক্ষিত বিভিন্ন নিদর্শন, আলোকচিত্র, দলিলপত্র ও স্মারক পরিদর্শন করেন। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ, আন্দোলনে মানুষের অংশগ্রহণ এবং বিজয়ের ইতিহাস নিয়ে তৈরি প্রদর্শনীগুলোও ঘুরে দেখেন তিনি। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে জাইমা রহমান তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

 

জাদুঘরটি তৈরি করা হয়েছে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনকে রূপান্তর করে এখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নানা স্মৃতি, দলিল ও নিদর্শন সংরক্ষণ করা হয়েছে। নানা জটিলতার কারণে এতদিন এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে জাদুঘরটির উদ্বোধন হলো।

 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ওই দিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। এরপর বিপুলসংখ্যক মানুষ গণভবনে প্রবেশ করেন। সেখানে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি ভবনের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। পরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ৮ আগস্ট শপথ নেয়।

 

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গণভবনকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর উপদেষ্টা পরিষদ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়। এরপর জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।

 

জাদুঘরের বিভিন্ন অংশে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের আলোকচিত্র, আন্দোলনসংশ্লিষ্ট স্মারক, শহীদদের ব্যবহৃত পোশাক, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র, গুরুত্বপূর্ণ দলিল, সে সময়ের সংবাদপত্রের কাটিং এবং অডিও-ভিডিওসহ নানা উপকরণ রাখা হয়েছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘটনাপ্রবাহও বিভিন্ন প্রদর্শনীর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

 

এ ছাড়া জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অভিযোগ, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর হামলা এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার তথ্য, আলোকচিত্র ও তথ্যচিত্র স্থান পেয়েছে। ভবনের নিচতলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কক্ষ, বারান্দা, করিডোর ও উন্মুক্ত প্রাঙ্গণেও ওই সময়ের নানা স্মৃতি, দলিল ও ঐতিহাসিক উপস্থাপনা রাখা হয়েছে।

 

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ, গণমানুষের অংশগ্রহণ ও বিজয়ের ইতিহাসভিত্তিক একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। জুলাই যোদ্ধা ও জুলাইয়ে নিহত পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকেও আন্দোলনের বীরত্বগাথা ও আত্মত্যাগের স্মৃতিচারণ করা হয়। সাংস্কৃতিক পর্বে দেশাত্মবোধক গান, আবৃত্তি ও বিভিন্ন পরিবেশনার মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, দেশপ্রেম ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তুলে ধরা হয়।

 

অনুষ্ঠানে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া কূটনীতিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিজন, জুলাই যোদ্ধা, জুলাইয়ে নিহত পরিবারের সদস্য, রাজনৈতিক ব্যক্তি, গণমাধ্যমকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

 

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সেই আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণ, সংগ্রামের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং জুলাইয়ে নিহত ও আহতদের আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

 

উদ্বোধনের দিন বুধবার (৫ আগস্ট) জাদুঘরটি শুধু আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য খোলা রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) থেকে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য এটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। নির্ধারিত প্রবেশমূল্য দিয়ে সাধারণ মানুষ জাদুঘরটি পরিদর্শন করতে পারবেন।

 

দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য অনলাইনে টিকিট সংগ্রহের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য টিকিটের মূল্য ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।