জেলা প্রতিনিধি :
বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রধান ফটকের কাছে বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পর আদালত চত্বরে বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে ‘পটকা’ বললেও ঘটনাস্থলে থাকা কয়েকজন আইনজীবী ও অন্য সূত্রে এটিকে ককটেল বা ককটেল সদৃশ বস্তুর বিস্ফোরণ বলে দাবি করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে সিআইডি।
বিস্ফোরণটি আদালতের মূল প্রবেশ ফটকের পাশে জুডিশিয়াল ভবনের সামনের এলাকায় ঘটে। বিকট শব্দ শুনে প্রথমে অনেকে এটিকে ট্রান্সফর্মার কিংবা গাড়ির টায়ার বিস্ফোরণ বলে ধারণা করেন। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে বিস্ফোরণের আলামত দেখতে পান তারা। বিস্ফোরণের পর ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে আদালত চত্বরে আতঙ্ক তৈরি হয় এবং অনেকে নিরাপদ স্থানে সরে যান।
ঘটনার খবর পেয়ে বরিশাল মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পুলিশের পাশাপাশি র্যাব এবং সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের সদস্যরাও সেখানে গিয়ে আলামত সংগ্রহ করেন। আদালত এলাকা ঘিরে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বরিশাল মহানগর পুলিশের কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ বলেন, বিকট শব্দে ‘পটকা’ ফোটার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে।
তিনি আরও জানান, বিস্ফোরণটি বড় ধরনের কোনো ঘটনা নয়। তবে এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা দ্রুত শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে ঘটনাস্থলে থাকা কয়েকজন আইনজীবী ও প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় বিস্ফোরণটিকে ককটেল বা ককটেল সদৃশ বস্তুর বিস্ফোরণ বলা হয়েছে। একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থল থেকে কাচের গুঁড়ো ও প্লাস্টিকের টুকরোসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে।
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আল মামুন উল ইসলাম বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে কী ধরনের বিস্ফোরণ ঘটেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করে বলতে চাননি তিনি।
বরিশাল মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার সুশান্ত সরকার বলেন, সিআইডির টিম ঘটনাটি তদন্ত শুরু করেছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত বলা যাবে। ঘটনার পর আদালত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
কোর্ট পরিদর্শক তারক বিশ্বাসও জানান, বিস্ফোরণটি কীভাবে ঘটেছে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। কেউ হতাহত হননি। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বিস্ফোরণের পর আদালতে আসা বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যান। আতঙ্কের কারণে কিছু সময়ের জন্য আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে আবার কার্যক্রম শুরু হয়।
বিস্ফোরণের পর বরিশাল মহানগর পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং আদালতের বিচারকেরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। নিরাপত্তার স্বার্থে আদালত প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ঘটনাটিকে পরিকল্পিত নাশকতা বলে দাবি করেছেন কয়েকজন আইনজীবী। বরিশাল মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট নাজিম উদ্দীন আহমেদ পান্না বলেন, অগণতান্ত্রিক শক্তি এ ঘটনার পেছনে থাকতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন।
অ্যাডভোকেট এইচএম তসলিম উদ্দিন অভিযোগ করেন, বাইরে থাকা ‘ফ্যাসিস্টের দোসররা’ এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাদের গ্রেপ্তার না করার কারণেই দেশ অশান্ত হয়ে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। দেশকে অশান্ত করার পাঁয়তারা যারা করছে, তাদের রুখে দিতে জনগণ ও জাতীয়তাবাদী শক্তি মাঠে রয়েছে বলেও তিনি বলেন।
অ্যাডভোকেট একেএম মীর জাহিদুল কবিরও দাবি করেন, নাশকতার উদ্দেশ্যেই ‘ফ্যাসিস্টদের দোসররা’ ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। আগামী ১৬ আগস্ট বরিশালে আইনমন্ত্রীর আসার কথা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করার জন্য একটি মহল পাঁয়তারা চালাচ্ছে।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য অ্যাডভোকেট তসলিম উদ্দিনের বক্তব্যেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার দাবি, আগামী ১৬ আগস্ট আইনমন্ত্রীর বরিশালে আসার কথা রয়েছে। তাকে যেন সেখানে আসতে না দেওয়া যায় এবং জনমনে ভীতি তৈরি করা যায়, সেই উদ্দেশ্যে এ ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন।
তবে আইনজীবীদের এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তে নিশ্চিত হয়নি। বিস্ফোরণের উদ্দেশ্য কী ছিল বা এর সঙ্গে কারা জড়িত, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
ঘটনার পর আদালত ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব ফুটেজ পর্যালোচনা করে বিস্ফোরণের আগে ও পরে সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তির চলাচল ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থল পরীক্ষা করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে। বিস্ফোরিত বস্তুটির প্রকৃতি এবং কীভাবে বিস্ফোরণটি ঘটেছে, তা পরীক্ষা করে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তদন্ত শেষে বিস্ফোরণটি পটকা, ককটেল নাকি অন্য কোনো ধরনের বস্তু দিয়ে ঘটানো হয়েছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে আদালতের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।











