রাজধানীতে তৎপর পেশাদার খুনি ও চুক্তিভিত্তিক কিলার গ্রুপগুলো

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজধানীতে তৎপরতা চালাচ্ছে পেশাদার খুনি ও চুক্তিভিত্তিক কিলার গ্রুপগুলো। ফলে বাড়ছে খুনোখুনি। চলতি বছরের গত ৬ মাসে রাজধানীতে ১২২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তার মধ্যে একটি বড় অংশই চুক্তিভিত্তিক শুটারদের প্রকাশ্য ও চোরাগুপ্তা হামলায় ঘটেছে। বর্তমানে কয়েকটি কিলার গ্রুপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে রাজধানীর অপরাধ জগত। কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হওয়া কিংবা বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আড়ালে থেকে নির্দেশনা দিচ্ছে কিলারদের। মূলত এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, ফুটপাত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের চাঁদাবাজি, মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ এবং আসন্ন সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই ঘটছে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। রাজধানী এখন অর্ধশতাধিক পেশাদার কিলারগ্রুপ হত্যাকণ্ডগুলোতে অংশ নিচ্ছে। আইন-শৃৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে ঢাকার অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণে পেশাদার খুনি ও চুক্তিভিত্তিক কিলার গ্রুপগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাতে অবশ্য সন্ত্রাসীরা নিজেরাও খুনের শিকার হচ্ছে। রাজধানীর মিরপুর, পল্লবী, ভাসানটেক, কাফরুল, বাড্ডা, সবুজবাগ এবং মোহাম্মদপুর এলাকায় কিলারদের মুভমেন্ট সবচেয়ে বেশি। আর পেশাদার কিলারদের কাছে ছোট ও ভারী দুই ধরনের অত্যাধুনিক বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। মালবাহী পরিবহনের মাধ্যমে সীমান্ত দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করছে ওই ছোট অস্ত্রগুলো। যদিও চলতি বছরের মে মাস থেকে শুরু হওয়া পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে সারা দেশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৭৬টি পিস্তল, ৩০টি শুটার গান, ৩৩টি এলজি এবং অন্যান্য ভারী আগ্নেয়াস্ত্র।

 

সূত্র জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন দেশে বসে ঢাকার ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের ফোনে হুমকি দিয়ে দাবি করছে মোটা অঙ্কের চাঁদা। আর চাঁদা না দিলেই পেশাদার কিলারদের লেলিয়ে দেয়া হচ্ছে। আর পেশাদার অপরাধীদের হাতে জুলাই আন্দোলনকালে বিভিন্ন থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্রের একটি বড় অংশ রয়েছে এখনো। পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্রের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৩৭৫টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ৮৪৯ রাউন্ড গুলি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আর অস্ত্র ও গুলির ব্যবহার চুক্তিভিত্তিক কিলিং মিশনে বাড়ছে। তাছাড়াও সীমান্ত গলে দেশে প্রবেশ করছে ঢাকায় অপরাধে ব্যবহৃত অস্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক অস্ত্র কারবারিরা দেশের প্রধান ১৭ থেকে ৩০টি রুট ব্যবহার করে অস্ত্র পাচার করছে। কিলারদের কাছে থাকা ছোট আগ্নেয়াস্ত্র মূলত যশোরের বেনাপোল, শার্শা, চৌগাছা এবং দর্শনা সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে। আর চাঁপাইনবাবগঞ্জের অরক্ষিত সীমান্তপথ অস্ত্র চোরাচালানের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট। রাজশাহী ও নওগাঁ হয়ে সেগুলো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া মিয়ানমার ও ভারতের মিজোরাম সীমান্তহয়ে ভারী অস্ত্র, সাব-মেশিনগান এবং হ্যান্ড গ্রেনেড টেকনাফ ও উখিয়া রুট দিয়ে প্রবেশ করে দেশে।

 

এদিকে সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, অপরাধীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে তাদের কঠোরভাবে দমন করা জরুরি। সেক্ষেত্রে শুধু নিয়মিত মামলার পরিসংখ্যান দিয়ে ঢাকার ভেতরের ওই গভীর অপরাধ চক্রকে আড়াল করা যাবে না। বরং ভাড়াটে শুটারদের নতুন তৎপরতা ঠেকাতে ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধি এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান জোরদার করা জরুরি।

 

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, সন্ত্রাসীদের কোনো দল নেই। পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ মিরপুর-১৩ এলাকায় যুবদল কর্মী ইউসুফ আলীকে গুলি করে হত্যার ঘটনা তদন্তে নেমে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) চুক্তিভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ পেয়েছে। প্রতিপক্ষ এক রাজনৈতিক নেতাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২৫ লাখ টাকার চুক্তি (সুপারি) করা হয়েছিল। ওই মিশন সফল করতে ঝিনাইদহ ও মাগুরা অঞ্চল থেকে ৪ জন পেশাদার শুটারকে ঢাকায় ভাড়া করে আনা হয়। হামলায় মূল টার্গেট অক্ষত থাকলেও গুলিতে প্রাণ হারান একজন। ওই ঘটনায় জড়িত শুটারসহ ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।