আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে জনমনে উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সামপ্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান ও আশঙ্কাজনক অবনতিতে জনমনে চরম উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাতের বেলা দূরপাল্লার মহাসড়কে সংগঠিত নৈরাজ্য এবং বাজারে প্রকাশ্যে অনৈতিক চাঁদাবাজির পাশাপাশি নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার নজিরবিহীন ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তথাকথিত ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং বেআইনি সামাজিক সালিশের পুনরুত্থান, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন’ (এমএসএফ)-এর সদ্য প্রকাশিত এক বিস্তারিত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত জুলাই মাসের তুলনায় সদ্য সমাপ্ত আগস্ট মাসে দেশে হত্যা, আত্মহত্যা, অপহরণ, নিখোঁজ এবং নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিটি সূচকেই অপরাধমূলক ঘটনা রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। ওই তথ্যমতে, এক মাসের ব্যবধানে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ৩০৬টি থেকে বেড়ে ৩২৭টিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে নারী ও শিশু হত্যার ঘটনা জুলাইয়ের ৫২টি থেকে আগস্টে একলাফে ৯১টিতে পৌঁছেছে, যা প্রায় ৭৫ শতাংশের এক ভীতিকর বৃদ্ধি। সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম শিথিলতা ও অপরাধীদের ছাড় দেওয়ার সুযোগে অপরাধচক্রগুলো কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, তা এমএসএফ-এর পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ৭২ শতাংশ এবং ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার ঘটনা ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সাথে আত্মহত্যা ৩৯ শতাংশ, অপহরণ ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ৮ শতাংশ এবং মাদক সংক্রান্ত মামলায় আটকের সংখ্যা ১২৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। কেবল অপরাধের সংখ্যাই বাড়েনি, বরং প্রচলিত আইনি ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গ্রামগঞ্জে বেআইনি সালিশ বসিয়ে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার এক মধ্যযুগীয় প্রথা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। গাইবান্ধায় ধর্ষণের এক ঘটনায় ভুক্তভোগীকে অভিযুক্তের সাথে সাত লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে দেওয়া, নোয়াখালী ও কুমিল্লায় শিশুদের ওপর যৌন হয়রানির অভিযোগে গ্রাম্য সালিশে বেত্রাঘাত ও অর্থদণ্ড দিয়ে বিচার এড়ানোর চেষ্টা এবং শরীয়তপুরে ১২ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা মাত্র এক লাখ টাকায় মীমাংসার মতো অমানবিক নজির নথিভুক্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি লালমনিরহাটে অনলাইন জুয়ার প্রতিবাদ করায় এক শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা এবং তিনটি জীবিত নবজাতককে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধারের ঘটনা সামাজিক অস্থিতিশীলতার গভীর ক্ষতকেই ফুটিয়ে তোলে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই ক্রমঅবনতির নেপথ্যে মূলত পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত পুনর্গঠন প্রক্রিয়া, থানাগুলোর নিয়মিত টহল ব্যবস্থার ঘাটতি এবং কার্যকর গোয়েন্দা নজরদারির অভাব প্রধান ভূমিকা রাখছে। এই সুযোগে অলিগলিতে কিশোর গ্যাং ও আঞ্চলিক সন্ত্রাসী চক্রের দাপট বাড়ার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও সংঘাত ও নৈরাজ্য নতুন মাত্রা পেয়েছে। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহতের সংখ্যা কিছুটা কমলেও আহতের সংখ্যা ৯৫ জন থেকে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ২৬৭ জনে দাঁড়িয়েছে, যেখানে বিএনপি, এনসিপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দলের অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃদলীয় সংঘর্ষ মূল ভূমিকা রেখেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন পরবর্তী মামলায় গ্রেপ্তারের গতি বাড়ার সাথে সাথে আগস্টে বিশেষ অভিযানে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার বড় অংশই মাদকসংক্রান্ত। তবে বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি ভিত্তি, আসামির সুরক্ষার অধিকার এবং রাজনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি নজরদারির আওতায় রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে। এদিকে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে অন্তত ৩৭ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হওয়া এবং গ্রেপ্তার ও মামলার ঘটনা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। এর চেয়েও ভীতিজনক বিষয় হলো, দেশের নদনদী, ডোবা, সড়ক ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে আগস্ট মাসে ৭১টি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যার বেশ কয়েকটি ছিল গলা কাটা, বস্তাবন্দি কিংবা হাত-পা বাঁধা রক্তাক্ত অবস্থায়। সামগ্রিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে আগস্টে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের ওপর নির্যাতনের চিত্রও বিশেষভাবে উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে, যেখানে সহিংসতার ঘটনা জুলাইয়ের ৮টি থেকে বেড়ে ২৬টিতে পৌঁছেছে। ফরিদপুর ও চট্টগ্রামে প্রতিমা ভাঙচুর ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও প্রাণহানির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর বাইরে সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিবর্ষণ, নির্যাতন ও জোরপূর্বক পুশ-ইনের চেষ্টা বজায় থাকায় সীমান্ত ঘেঁষা মানুষের নিরাপত্তাহীনতা দূর হয়নি। নিরাপত্তা ও মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধের এই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে হলে কেবল পাইকারি গ্রেপ্তার বা সাময়িক বিশেষ অভিযান চালিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। জরুরি ভিত্তিতে থানা ও মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পূর্ণাঙ্গ পরিচালন সক্ষমতা দ্রুত পুনর্বাহাল করতে হবে। একই সাথে মব বিচার ও বেআইনি সালিশ কঠোর হস্তে দমন করে প্রতিটি হত্যা, ধর্ষণ ও অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করার মাধ্যমেই জনমনে হৃত আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।