নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন ধরে চরম বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও আমদানিনির্ভরতার এক সুগভীর ঝুঁকির মুখোমুখি অবস্থান করছে। মোট ব্যবহৃত প্রাথমিক জ্বালানির একটি সিংহভাগ বিদেশী আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ করতে গিয়ে জাতীয় অর্থনীতি বারবার ডলারের অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অস্বাভাবিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটজনিত বিশ্ববাজারের মূল্যবৃদ্ধির মুখে পড়ছে। বিশ্ববাজার থেকে চড়া দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি এবং খনিজ তেল এনে দেশের শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর যে কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় শক্তি নিরাপত্তার ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে তুলেছে। জ্বালানি বিশ্লেষক ও ভূতত্ত্ববিদদের মতে, যেকোনো বহিঃস্থ আঘাত বা আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটলেই যদি দেশের গৃহস্থালি, শিল্প খাত ও সার্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদন থমকে যায়, তবে তা একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য মারাত্মক সংকেত। এই পরিস্থিতিতে আমদানিনির্ভরতার ধ্বংসাত্মক পথ থেকে সরে এসে নিজস্ব ভূখণ্ড ও বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করার জোর তাগিদ দিয়েছেন দেশের প্রখ্যাত জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, দেশের মোট ব্যবহৃত প্রাথমিক জ্বালানির প্রায় ৬৫ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার এক বড় অংশ বিদেশি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় যেকোনো বৈশ্বিক বা স্থানীয় অস্থিরতায় পুরো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত মারাত্মক সংকটের মুখে পড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের তীব্র টানাপোড়েন কিংবা সরবরাহ শৃঙ্খলে সামান্যতম ব্যঘাত ঘটলেই দেশজুড়ে গ্যাসসংকট ও বিদ্যুতের লোডশেডিং নতুন ও তীব্র রূপ ধারণ করছে। এই অবস্থায় আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় কূপ খনন ও অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করাকে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ভূগর্ভস্থ নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনে অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা না গেলে আগামীতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যবস্থা ও সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। জ্বালানি খাতের সার্বিক চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কারখানা ও বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাহিদা বাড়লেও দেশীয় কূপগুলোর উৎপাদন প্রতি বছরই ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে সর্বসাকুল্যে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়, যার একটি বড় অংশই মেটাতে হয় চড়া দামে কেনা আন্তর্জাতিক এলএনজি দিয়ে। কিন্তু ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে সামান্য কারিগরি ত্রুটি বা সাগরে বৈরী আবহাওয়া দেখা দিলেই এলএনজি খালাস ও সরবরাহ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এতে মুহূর্তেই জাতীয় সঞ্চালন লাইনে গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়, যার সরাসরি আঘাত গিয়ে পড়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ওপর। গ্যাসসংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন এক ধাক্কায় দেড় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত কমে যায়, যার ফলে দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ের সৃষ্টি হয়। এছাড়া উপকূলীয় এলাকায় স্থাপিত ভাসমান টার্মিনালগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা মেরামতকাজের জন্য বন্ধ রাখতে হলে জাতীয় সংকট চরম আকার ধারণ করে। বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎ সচল রাখতে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর চেষ্টা করা হলেও জাতীয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের লোকসান ও দেনার পরিমাণ আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে, যা সামগ্রিক বিদ্যুৎ খাতকে এক চিরস্থায়ী ঋণের চক্রে আটকে ফেলছে। ভূ-তাত্ত্বিক গবেষকদের মতে, জ্বালানির এই অচল অবস্থা ও ডলার সংকটের জন্য মূলত বিগত বছরগুলোর অদূরদর্শী নীতি ও অন্বেষণহীনতা দায়ী। ভূ-তাত্ত্বিক কাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশ অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এক হাইড্রোকার্বন অববাহিকায় অবস্থিত। আসাম, মিয়ানমার বা মালয়েশিয়ার মতো সংলগ্ন গ্যাসসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর ভূগর্ভস্থ কাঠামোর সাথে বাংলাদেশের মাটির গভীরের শিলাস্তরের হুবহু বৈজ্ঞানিক মিল রয়েছে, যা নির্দেশ করে যে আমাদের ভূখণ্ড ও সাগরে প্রচুর গ্যাসের প্রাকৃতিক সঞ্চয় রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব মাটিতে প্রয়োজনীয় নতুন অনুসন্ধান কূপ খনন ও সাগরে দ্বিমাত্রিক বা ত্রিমাত্রিক ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনায় অনীহা দেখানো হয়েছে। তড়িৎ সমাধানের নামে বিশ্ববাজার থেকে এলএনজি ক্রয়ের নীতি গ্রহণ করায় জাতীয় কোষাগার থেকে প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থ এলএনজি আমদানিতে ব্যয় করা হয়, তার সামান্য একটি অংশ দিয়ে দেশে আন্তর্জাতিক মানের ব্যাপক ড্রিলিং কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব ছিল। দীর্ঘমেয়াদি অন্বেষণ বন্ধ রেখে বিদেশি গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেই আজ সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক ও ভারী শিল্পের মালিকদের চরম খেসারত দিতে হচ্ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে স্থায়ী উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য একটি কালভিত্তিক ও বাধ্যবাধকতামূলক জাতীয় রূপরেখা বাস্তবায়নের পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের মতে, বঙ্গোপসাগরে থাকা খনিজ সম্পদ আহরণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করার জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট বা পিএসসি রূপরেখা চূড়ান্ত করে দ্রুত দরপত্র প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। গভীর ও অগভীর সমুদ্রের পাশাপাশি উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দেশের পার্বত্য এলাকার জটিল ভূতাত্ত্বিক কাঠামোতে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গভীর কূপ খননের ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। একই সাথে রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান সংস্থা বাপেজের কারিগরি সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা এবং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে নতুন কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস যুক্ত করার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। নিজস্ব ভূখণ্ড থেকে উত্তোলিত গ্যাস যেমন আমদানিকৃত এলএনজির তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী, তেমনি এটি দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থাকে বৈশ্বিক বাজার বা আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার ঝুঁকি থেকেও চিরতরে মুক্ত রাখবে। জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত করার এই লড়াইয়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের সুষম উত্তোলনের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে সমন্বিত কৌশল গ্রহণের কথাও বলছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র ঘাটতি সামাল দিতে সাময়িক আমদানি অব্যাহত রাখতে হলেও নিজস্ব সম্পদকে অবহেলা করার সুযোগ আর নেই। পরিকল্পিত ড্রিলিং ও অন্বেষণ কার্যক্রম বাড়িয়ে দেশীয় গ্যাসের উত্তোলন সুনিশ্চিত করা সম্ভব হলেই কেবল বাংলাদেশ বর্তমানের এই অনিশ্চিত আমদানিনির্ভরতা থেকে মুক্ত হয়ে এক টেকসই ও স্বাধীন অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।











