এআই নিয়ে আইন প্রণয়নে কাজ করছে সরকার: আইনমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক:

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে আইন প্রণয়নে কাজ করছে সরকার। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ নিয়ে খসড়ায় প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজনের পর তা বিল আকারে সংসদে উপস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

 

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ মিলনায়তনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে, লিগালাইজড এডুকেশন বাংলাদেশ এবং দ্য সোসাইটি ফর জাস্টিস অ্যান্ড এআই (এসজেএআই)-এর সহযোগিতায় আয়োজিত ‘বাংলাদেশ এআই গভর্ন্যান্স সামার স্কুল ২০২৬’-এর পাঁচ দিনব্যাপী নির্বাহী পর্যায়ের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

 

আইনমন্ত্রী বলেন, সময়ের সঙ্গে আইনের গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। নতুন প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইন ও নীতিমালাকেও যুগোপযোগী করতে হবে। এআইয়ের ব্যবহার যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি এর অপব্যবহারও নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

 

তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্ব এআই যুগে প্রবেশ করেছে। কিন্তু এআই ব্যবহারের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এখনো যথাযথভাবে গড়ে ওঠেনি। এআই মানুষের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে। আবার কখনো সঠিক, কখনো বিভ্রান্তিকর পথে মানুষকে পরিচালিত করারও সক্ষমতা এর রয়েছে।

 

আইনমন্ত্রী জানান, এআই ব্যবহার করে কারও কণ্ঠস্বর নকল করা, ছবি পরিবর্তন বা সুপারইম্পোজ করা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যকে মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে উপস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে। এসব ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রয়োজন।

 

বিচারব্যবস্থায় এআইয়ের ব্যবহার নিয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। আইনমন্ত্রী বলেন, বিচারকেরা রায় লেখার ক্ষেত্রে এআইয়ের সহায়তা নিতে পারেন, তবে এর ওপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। রায় লেখার সময় বিচারককে নথিপত্র ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সাক্ষ্য-প্রমাণ সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করার পাশাপাশি এআইয়ের তৈরি তথ্য ও প্রকৃত তথ্যের মধ্যে পার্থক্যও যাচাই করতে হবে।

 

তিনি বলেন, কোনো বিচারককে এআইয়ের মাধ্যমে প্রভাবিত বা বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হলে তার প্রভাব বিচারিক সিদ্ধান্তের ওপর পড়তে পারে। তাই বিচারকদের সবার আগে এআই সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের সময় কোনো তথ্য বা উপাদান এআই-নির্ভর কি না, সেটিও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

 

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এআইয়ের সহায়তা নেওয়া যেতেই পারে। যে কারও কাছ থেকেই সহায়তা নেওয়া যায়। যে কোনো জায়গা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। তবে সাক্ষ্য পর্যালোচনার ক্ষেত্রে বিচারককে নিজস্ব মেধা, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও সততা প্রয়োগ করতে হবে।’

 

তিনি আরও বলেন, আইন সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় এবং বিচারিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে আইনের গতিপথও নির্ধারিত হয়। বিভিন্ন সময়ে বিচারিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে আইনের নতুন নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে। এআইও বিচারব্যবস্থার সামনে তেমন একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছে। যথাযথ আইন ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত বিচারকদের নিজস্ব প্রজ্ঞা ও বিচারিক বিচক্ষণতা প্রয়োগ করতে হবে।

 

আইনমন্ত্রী জানান, এআই নিষিদ্ধ করার কোনো চিন্তা সরকারের নেই। বরং এআইয়ের ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর অপব্যবহার যাতে না হয়, সেদিকে সরকার সতর্ক থাকবে।

 

এআই নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ প্রয়োজন। তাদের মতামত পাওয়ার পর খসড়ায় প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজন করে বিল আকারে সংসদে আনা হবে। নতুন প্রযুক্তি ও পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইন ও নীতিমালাকে যুগোপযোগী করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

 

আইনসংক্রান্ত বিষয়ে এআই ব্যবহারের বিভিন্ন দিক সরকার যাচাই-বাছাই করছে জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘সাইবার সিকিউরিটি ল’-এর সঙ্গে কীভাবে এটিকে যুক্ত করা যায়, তা নিয়েও কাজ চলছে। এ বিষয়ে যারা গবেষণা, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম করছেন, তারা এআই-সংক্রান্ত আইন প্রণয়নে সহযোগিতা করলে সরকার তা সাদরে গ্রহণ করবে।

 

এআই নিয়ে আইন তৈরির ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, গবেষক ও পেশাজীবীদের মতামতকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য, গঠনমূলক সমালোচনা ও মতামতের মাধ্যমে একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়ন সম্ভব।

 

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার কোনো সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে চায় না। বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে যে সিদ্ধান্তকে অধিকতর যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য মনে হবে, সরকার সে পথেই এগিয়ে যেতে চায়।

 

তিনি অনুষ্ঠানের আয়োজকদের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এআই বিষয়ে কার্যকর আইন প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কামনা করেন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে একটি খসড়া প্রস্তুত করে দ্রুত সরকারের কাছে উপস্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।

 

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার তাসনোভা শেলীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান এবং অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ একরামুল হক।