নিজস্ব প্রতিবেদক:
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে ভূকম্পন জরিপ, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা, পিএসসি ও আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে অনুসন্ধান এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণসহ পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার। পাশাপাশি আগামী ১০ বছরের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় ফুলবাড়ীর কয়লা উত্তোলন, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং নতুন বিমানঘাঁটি ও রানওয়ে নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহারের বিষয়েও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান না করা এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশে বর্তমান জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় সরকার সমন্বিতভাবে পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো, ভূকম্পন জরিপের মাধ্যমে নতুন গ্যাসের সন্ধান, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) শক্তিশালী করা, প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট (পিএসসি) ও দরপত্রের মাধ্যমে গ্যাস অনুসন্ধান এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস যুক্ত হয়েছে।
আরও সাতটি কূপের কাজ বর্তমানে চলমান। এগুলোর কাজ শেষ হলে জাতীয় গ্রিডে আরও ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত হবে। বাকি কূপগুলো পর্যায়ক্রমে খনন ও ওয়ার্কওভারের আওতায় নেওয়া হবে।
দেশে নতুন গ্যাসের সন্ধানে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২-ডি এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩-ডি ভূকম্পন জরিপের পরিকল্পনা রয়েছে। বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে দুটি নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়াও চলছে।
এ ছাড়া অফশোর মডেল পিএসসি-২০২৬ অনুমোদন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদনের প্রক্রিয়াও চলছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অফশোর ও অনশোর এলাকায় সফলভাবে গ্যাস অনুসন্ধান করা গেলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল
এলএনজি সরবরাহ বাড়াতেও সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। মহেশখালীর গভীর সমুদ্র ও কুতুবজোম এলাকায় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এটি থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে রিগ্যাসিফায়েড এলএনজি সরবরাহ শুরু করার প্রত্যাশা রয়েছে।
আগামী দুই বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানি আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
পাশাপাশি পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলে জরুরি ভিত্তিতে নতুন ২/১টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগ সরকার বাপেক্সকে পঙ্গু করে দিয়েছিল, যার কারণে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকার বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছে।
১০ বছরের বিদ্যুৎ-জ্বালানি পরিকল্পনা
কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশের আলম ভূঁইয়ার সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ১০ বছরের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনার কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ চলছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত আগামী ১০ বছরে কীভাবে সাজানো হবে, সে বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী শিগগিরই সংসদ ও জনগণের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরবেন বলে জানান তিনি। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য সামনে রেখেই এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ফুলবাড়ীর কয়লা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন নাহার মুন্নীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী ফুলবাড়ীর কয়লা উত্তোলনের বিষয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, সরকার জ্বালানি সমস্যার সমাধান করতে চায়। তাঁর ভাষ্য, ফুলবাড়ীর কয়লা “পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো কয়লার মধ্যে একটি”। এই কয়লা উত্তোলন করা গেলে বিদেশি মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দেশের জন্য তা উপকারী হতে পারে।
তবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হলে সেখানে বসতবাড়ি ও কৃষিজমি রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে স্থানীয় মানুষকে কীভাবে পুনর্বাসন করা হবে, সেটি ঠিক করতে হবে। তাঁদের আয়-রোজগার যেন বন্ধ না হয় এবং প্রকল্প থেকে স্থানীয় মানুষও যেন উপকৃত হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, সব ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে পরিবেশকে অগ্রাধিকার দিয়েই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বাড়ানোর উদ্যোগ
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতেও সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।
গত ৬ জুন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে প্রয়োজনীয় প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারিসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে শর্তসাপেক্ষে কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি, অগ্রিম আয়কর এবং অতিরিক্ত ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।
আগামী ছয় মাস ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ থেকে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কেনার কথা জানিয়েছে সরকার। পাইকারি দরের অতিরিক্ত অর্থ প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হবে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় খরচ ৬ থেকে ৭ টাকা হওয়ায় এতে সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফার সুযোগ রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ মুনাফা ও ৫ শতাংশ প্রিমিয়াম প্রযোজ্য হবে এবং এ সুবিধা তিন বছরের জন্য কার্যকর থাকবে।
সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর জন্য নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
নতুন বিমানঘাঁটি নয়, বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহারের তাগিদ
প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে বিমানবাহিনীর অবকাঠামো নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনার কথা উঠে আসে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহফুজা হান্নানের লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিমানবাহিনীকে আধুনিক ও শক্তিশালী করতে বাস্তবসম্মত এবং ব্যয় সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। আকাশ ও সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও এতে বিবেচনায় রাখতে হবে।
প্রতিটি অঞ্চলে প্রশিক্ষণের জন্য আলাদা বিমানঘাঁটি, নতুন রানওয়ে ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সব অঞ্চলে শিল্প ও পরিবহন অবকাঠামো সমানভাবে গড়ে ওঠেনি। তাই বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সামরিক প্রশিক্ষণ ও প্রশাসনিক ব্যয় কমাতে শুধু নিয়মিত প্রশিক্ষণের জন্য নতুন রানওয়ে নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান সুবিধাগুলো যথাসম্ভব ও সঠিকভাবে ব্যবহার করাই বেশি কার্যকর।
এতে সরকারি অর্থ ও সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বের শুরুতে ৩০ মিনিট সময় নির্ধারিত ছিল। মোট আটটি লিখিত প্রশ্নের মধ্যে তিনি চারটির সরাসরি উত্তর দেন এবং ছয়টি সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন।











