দেশী-বিদেশী ঋণ বাড়লেও পিজিসিবির পর্যাপ্ত আয় নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশী-বিদেশী ঋণ বাড়লেও দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার একক প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) পর্যাপ্ত আয় নেই। ফলে বাড়ছে বিদ্যুৎ পরিচালন ঘাটতি। অথচ দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে প্রতিষ্ঠানটি দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার ঋণে সঞ্চালন লাইন, সাবস্টেশন ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্থাপন করছে। আর ওসব ঋণের অর্থেই নির্মাণ করা হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পটুয়াখালী-গোপালগঞ্জ, আমিনবাজার-গোপালগঞ্জ, দিনাজপুর ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সঞ্চালন লাইন। বর্তমানে সঞ্চালন লাইন ও অবকাঠামো উন্নয়নে পিজিসিবির ১৪টি প্রকল্প চলমান। আর ওসব প্রকল্পে দেশী-বিদেশী ঋণ মিলিয়ে প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। সব মিলিয়ে ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে সরকারের জন্য পাওয়ার গ্রিডের আর্থিক দায় ও ঝুঁকি। পিজিসিবি সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, পিজিসিবির ঋণের বোঝা বেড়েই চলেছে। বিগত ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে পাওয়ার গ্রিডের মোট ঋণ ছিল ৩০ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। আর সংরক্ষিত আয়ের উদ্বৃত্ত ছিল ৭৩৭ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবছরে সংস্থাটির ঋণ বেড়ে ৪০ হাজার ১৬৪ কোটি টাকায় দাঁড়ালেও সংরক্ষিত আয় ঋণাত্মক হয়ে লোকসান দাঁড়ায় ৬৪৮ কোটি টাকা। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঋণ বেড়ে ৪৯ হাজার ৯৭৫ কোটি এবং সংরক্ষিত লোকসান ১ হাজার ২৭৭ কোটি টাকায় পৌঁছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঋণ আরো বেড়ে ৫৯ হাজার ৬৯২ কোটি ও সংরক্ষিত লোকসান ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। আর সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত পিজিসিবির ঋণের স্থিতি ৬৬ হাজার ৩৪১ কোটি এবং সংরক্ষিত লোকসান ৯২১ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। ফলে ৩ বছরের মধ্যেই পাওয়ার গ্রিডের আর্থিক ঝুঁকি মাঝারি মান থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে উন্নীত হয়েছে উচ্চ পর্যায়ে। ওই অর্থবছর শেষে কোম্পানিটির মোট দায় প্রায় ৫৬ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩০ দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি। সংস্থাটির মোট ঋণের প্রায় ৮৯ শতাংশই সরকারের সঙ্গে করা সাবসিডিয়ারি লোন অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএলএ) ও লোন অ্যাগ্রিমেন্টের (এলএ) আওতায় নেয়া।

 

সূত্র জানায়, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ দেশের একমাত্র বিদ্যুৎ সঞ্চালন সংস্থা হিসেবে ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর এখন পর্যন্ত সংস্থাটির ৫ বার সঞ্চালন ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়েছে। তার মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ তিনবার এবং বিইআরসি দু’বার ট্যারিফ নির্ধারণ করে। বিগত ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সঞ্চালন ট্যারিফ বাড়ানোর পর সর্বশেষ চলতি বছরের জুনে তা আবারো বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার প্রায় পুরোটা পিজিসিবির ওপর নির্ভরশীল। তাতে সংস্থাটির ব্যয় দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য নেই কার্যকর প্রতিযোগিতামূলক বেঞ্চমার্ক। অথচ পিজিসিবির ক্ষেত্রে পূর্ণ কস্ট রিকভারি নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ সংস্থাটি যদি পূর্ণ ব্যয় আদায় করতে না পারে তাহলে ধারাবাহিক লোকসান হবে। আর ওই ঘাটতি শেষ পর্যন্ত পূরণ করতে হবে সরকারকেই ভর্তুকি দিয়ে। কিন্তু ভর্তুকির অর্থ ঋণ হিসেবে দেখানোর কারণে পিজিসিবির ওপর ধীরে ধীরে ঋণের বোঝা জমছে। মূলত সব মিলিয়ে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ, সঞ্চালন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া, হুইলিং চার্জের তুলনামূলক ধীর সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারজনিত ক্ষতি এবং পূর্ণ কস্ট রিকভারি না হওয়ার কারণেই ক্রমে বাড়ছে পিজিসিবির আর্থিক চাপ। পাশাপাশি সরকারের কাছ থেকে নেয়া অর্থের বড় অংশ ঋণ হিসেবে হিসাবভুক্ত হওয়ায় ওই দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ওপর বাড়াবে। এজন্যই বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর সমপ্রসারণের পাশাপাশি পিজিসিবির আর্থিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস, কস্ট রিকভারি নিশ্চিত করা এবং সরকারের অর্থায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

সূত্র আরো জানায়, পিজিসিবি সরকারের কাছ থেকে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়ের জন্য প্রতি বছর অর্থ নেয়। আর সরকারের কাছ থেকে নেয়া ওই অর্থের ৬০ শতাংশ ইকুইটি ও ৪০ শতাংশ ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইকুইটি হিসেবে নেয়া অর্থ কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে ডিপোজিটের পর শেয়ার হিসেবে দেখানো হয়। কারণ নিয়ম অনুসারে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডিপোজিট ফর শেয়ারের অর্থের বিপরীতে সরকারের অনুকূলে শেয়ার ইস্যু করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে বিনিয়োগকারীদের মুনাফার ভাগ হিসেবে লভ্যাংশ প্রদানের নিয়ম রয়েছে। সেজন্য কোম্পানির আয় ও মুনাফায় ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়নে ধীরগতির কারণে প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না পিজিসিবির আয় ও মুনাফা। অথচ প্রতি বছরই বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য পিজিসিবি সরকারের কাছ থেকে ইকুইটি হিসেবে বিপুল পরিমাণে অর্থ নিচ্ছে। আর ওই অর্থের বিপরীতে সংস্থাটিকে প্রচুরসংখ্যক শেয়ারও ইস্যু করতে হচ্ছে। তাতে পিজিসিবির আর্থিক সক্ষমতা আরো দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্যও তৈরি করছে ঝুঁকি।

 

এদিকে পিজিসিবি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় অংকের অবকাঠামো বিনিয়োগের বিপরীতে পিজিসিবির সঞ্চালন আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। মূলত নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সঞ্চালন না হওয়ায় আয় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যা সরাসরি কোম্পানির লোকসানে প্রভাব ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রে সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণের পরও তা পর্যাপ্তভাবে ব্যবহার না হলেও প্রতিষ্ঠানটিকে পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। গত কয়েক বছরে বিপিডিবির গ্যাসভিত্তিক বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকেও প্রত্যাশিত পরিমাণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন হয়নি। ফলে দূরবর্তী কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ক্ষেত্রে ট্রান্সমিশন লস বেড়েছে। তাতে একদিকে কমেছে সঞ্চালন আয়, অন্যদিকে অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় অব্যাহত থেকেছে। তাছাড়া পিজিসিবির আয়ের প্রধান উৎস হুইলিং বা সঞ্চালন চার্জ। ওই চার্জের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়নসহ সামগ্রিক ব্যয় নির্বাহ করা হয়। কিন্তু গত কয়েক বছর হুইলিং চার্জ বাড়ানো হয়নি। একই সময়ে বছরভিত্তিক যে পরিমাণ বিদ্যুৎ সঞ্চালনের প্রাক্কলন করা হয়েছিল তাও পূরণ হয়নি। তাতে ব্যয় বাড়লেও সংস্থাটির আয় বাড়েনি। তার সাথে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারজনিত ক্ষতিও যুক্ত হয়েছে । ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে পিজিসিবির ৩ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। আর বড় অঙ্কের বিদেশী ঋণ থাকায় বিনিময় হার পরিবর্তনের ওই চাপ কোম্পানির আর্থিক অবস্থায় পড়েছে সরাসরি।

 

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে পাওয়ার গ্রিডের পর্ষদে পরিচালক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী জানান, পাওয়ার গ্রিডের বড় অঙ্কের বিদেশী ঋণ রয়েছে। ফলে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হয়েছে। মুদ্রার অবমূল্যায়নজনিত এ ঝুঁকি প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবে পাওয়ার গ্রিডের সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে পর্ষদেও উদ্বেগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে এ অবস্থা থেকে বের করে আনতে পর্ষদে আলোচনার পাশাপাশি কিছু পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে।