অনলাইন ডেস্ক:
বিরল খনিজ সম্পদে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করার পর এবার ভারী নির্মাণ সরঞ্জাম খাতকে ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে চীন। চলতি মাসের শেষের দিকে বিশ্বজুড়ে সুড়ঙ্গ বা পাহাড়ি এলাকায় টানেল তৈরির কাজে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক টানেল বোরিং মেশিনসহ অন্যান্য ভারী নির্মাণ সরঞ্জাম রফতানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও কড়াকড়ি আরোপ করতে যাচ্ছে বেইজিং। চীনের এই নতুন ও আকস্মিক কৌশলগত পদক্ষেপ ভারতের উচ্চাভিলাষী ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর পথে এক বিশাল প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বেসামরিক অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি এই ধরনের ভারী সরঞ্জাম সামরিক প্রকল্পেও দ্বৈত ব্যবহার বা কাজে লাগতে পারে। এই নির্দিষ্ট যুক্তি সামনে এনে চীন সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, যেসব দেশের সঙ্গে তাদের সীমান্ত বিরোধ রয়েছে, সেই সংবেদনশীল দেশ ও অঞ্চলগুলোর ক্ষেত্রে এই নতুন ও কঠোর নিয়ম আরও কড়াকড়িভাবে প্রযোজ্য হবে।
হিমালয় সীমান্ত অঞ্চলে ভারত ও চীনের মধ্যকার চলমান সংঘাত এবং সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সার্বিক পটভূমিতে ভারতের সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও শক্তিশালী করতে রেল ও সড়ক নির্মাণ প্রকল্পগুলোর কাজ জোরেশোরে চলছে। এসব কৌশলগত প্রকল্পের জন্য প্রচুর পরিমাণে সুড়ঙ্গ খনন এবং উচ্চ পাহাড়ি এলাকায় কাজ করার মতো বিশেষ সরঞ্জামের প্রয়োজন হয়। সিনহুয়া ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কৌশল কেন্দ্রের ফেলো সুন চেংহাউ এই প্রসঙ্গে বলেছেন, চীনের মূল উদ্বেগ ও নজির হলো তাদের প্রকৌশলগত সক্ষমতা ঠিক কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে এবং তা অন্য কোনো দেশের সামরিক অবকাঠামোকে শক্তিশালী করে তুলছে কি না।
এদিকে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফেলো কাইল চ্যান জানিয়েছেন, বেইজিং ক্রমেই তাদের নির্মাণ সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক অবস্থানকে কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করছে, যা অন্যান্য দেশের জন্য ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি এবং অতিরিক্ত নির্ভরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের বিশিষ্ট বিশ্লেষক চেতনা কুমার জানিয়েছেন, চীনের এই কঠোর রফতানি নিয়ন্ত্রণ ভারতের বিরোধপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চলের কৌশলগত ও সংবেদনশীল প্রকল্পগুলোর কাজের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি এও উল্লেখ করেছেন যে, এই পরিস্থিতি ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে দেশীয় পন্থায় সরঞ্জাম তৈরির সম্ভাবনাকেও আরও বেশি জোরদার করবে।
নিউ দিল্লিভিত্তিক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব জানিয়েছেন, চীনের এই নতুন বিধিনিষেধ কেবল সম্পূর্ণ মেশিনের ওপরই নয়, বরং এর অতিপ্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশগুলোর ওপরও সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। এর ফলে ভারতের হাতে থাকা পুরনো মেশিনগুলোর যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখ্য, বর্তমান বিশ্বে টানেল কাটার ভারী সরঞ্জামের প্রায় ৭০ শতাংশ বৈশ্বিক বাজার একাই দখল করে রেখেছে চীন। এই পরিস্থিতির সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব সামাল দিতে ভারত এখন সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে মেশিন উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দেশটির সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রী নিতিন গডকরি দেশের স্থানীয় শিল্পখাতকে এগিয়ে এসে এসব অত্যাধুনিক মেশিন তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন। মুম্বাইভিত্তিক নামী প্রকৌশল জায়ান্ট লার্সেন অ্যান্ড টোব্রো (এলঅ্যান্ডটি)-র প্রেসিডেন্ট আর শঙ্কর রমন জানিয়েছেন যে, তারা বর্তমানে একটি প্রোটোটাইপ টানেল-বোরার তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, চীনের কম খরচে পণ্য উৎপাদনের এই বিশাল ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার সঙ্গে যদি ভারত পাল্লা দিতে না পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশটি বড় ধরনের পিছিয়ে পড়ার মুখে পড়বে।










