অনলাইন ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এক বড় রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যেখানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পেছনে ফেলে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণই নিজেদের হাতে নিতে যাচ্ছে বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টি। এর মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি শেষ দুটি বছর বেশ কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং করে তুলতে যাচ্ছে ডেমোক্র্যাটদের এই অভাবনীয় জয়।
আসন্ন ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে চলেছে ডেমোক্র্যাটরা। মূলত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান অজনপ্রিয়তা, মূল্যস্ফীতির চাপ, আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তৈরি হওয়া তীব্র অসন্তোষকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ জয় ঘরে তুলেছে দলটি।
প্রাপ্ত পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এই বিজয় শুধু প্রতিনিধি পরিষদেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং মার্কিন সিনেটেও এক বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। এমনকি রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের দুর্ভেদ্য শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কয়েকটি রাজ্যেও বড় জয় তুলে নিয়েছে তারা; যার মধ্যে রয়েছে সাউথ ক্যারোলাইনা, টেক্সাস, ওহাইও, কানসাস ও আইওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলো।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিগত ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই সাউথ ক্যারোলাইনা রাজ্যেই ১৮ শতাংশ পয়েন্টের বড় ব্যবধানে জয়লাভ করেছিলেন ট্রাম্প। অন্যদিকে, টেক্সাস রাজ্যে ১৯৯৪ সালের পর থেকে দীর্ঘ সময়েও রাজ্যব্যাপী কোনো নির্বাচনে জয় পাওয়ার স্বাদ পায়নি কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী, আর কানসাস রাজ্যে সর্বশেষ ১৯৩২ সালে ডেমোক্র্যাট দলের কোনো প্রার্থী সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে।
ভোটারদের এই মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেছে বিভিন্ন জরিপেও, যেখানে দেখা গেছে ১০ জনের মধ্যে ছয় জনেরও বেশি ভোটার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের প্রতি প্রকাশ্যেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে আবার অর্ধেকেরও বেশি ভোটার তাদের এই অসন্তোষের কথা অত্যন্ত তীব্রভাবে জানিয়েছেন এবং জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটারের সুনির্দিষ্ট মত হলো, ট্রাম্পের নেওয়া বিভিন্ন নীতির কারণেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির শোচনীয় অবনতি ঘটেছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের এই বিজয় অনেকটাই অনুমিত ও প্রত্যাশিত ছিল, কারণ সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে দলটির মাত্র তিনটি আসন নিজেদের ঝুলিতে বাড়াতে হতো। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নেওয়াকে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, কেননা এই অভাবনীয় জয় পেতে হলে ট্রাম্পের খোদ জয়ী হওয়া একাধিক রাজ্যে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে আসন ছিনিয়ে নিতে হয়েছে ডেমোক্র্যাটদের।
কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও প্রশাসনের জন্য নতুন সব চ্যালেঞ্জের জন্ম দেবে। এতদিন ধরে রিপাবলিকানদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্ত তুলনামূলকভাবে অনেক কম বাধার মুখে পড়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রম ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে তদন্ত করার বড় সুযোগ লাভ করবে এবং এসব উচ্চপর্যায়ের তদন্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তলব করার মতো আনুষ্ঠানিক সমন জারির ক্ষমতাও চলে যাবে তাদের হাতে।
শুধু তা-ই নয়, সিনেটের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে থাকায় ট্রাম্প প্রশাসনের যেকোনো বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়াও কার্যকরভাবে আটকে দিতে সক্ষম হবে ডেমোক্র্যাটরা। এমনকি দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা সুপ্রিম কোর্টে যদি কখনো কোনো বিচারকের পদ খালি হয়, তবে সেখানে ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থীর নিয়োগের ক্ষেত্রেও নানা ধরনের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বাধা তৈরি করতে পারবে তারা।
অবশ্য কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতে পেলেও ডেমোক্র্যাটদের জন্য নিজেদের ঘোষিত সব নীতি ও সিদ্ধান্ত একপেশেভাবে বাস্তবায়ন করা খুব একটা সহজ হবে না। দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের যেকোনো বিলে ভেটো দেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা বরাবরই বহাল রয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন সিনেটে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করতে হলে অন্তত ৬০টি ভোটের প্রয়োজন হয়, যা ডেমোক্র্যাটদের জন্য এককভাবে নিশ্চিত করা কঠিন। ফলে আগামী দুই বছরে হোয়াইট হাউসের ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক এবং আইন প্রণয়নসংক্রান্ত বিরোধ আরও তীব্র আকার ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায় যে, গত ৫০ বছরের দীর্ঘ সময়ে মাত্র দুবার এমন ঘটনা ঘটেছে, যেখানে একই নির্বাচনি চক্রের মধ্যে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ একটি রাজনৈতিক দল থেকে সম্পূর্ণভাবে অন্য দলের হাতের মুঠোয় চলে গেছে।











