শিক্ষানবিশ চালক ও মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট নিয়ে কঠোর নির্দেশনা দিল বিআরটিএ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

মূল ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া রাস্তায় মোটরযান চালানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), একই সঙ্গে শিক্ষানবিশ বা লার্নার লাইসেন্সধারীদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা এবং মোটরসাইকেলের সামনের নম্বরপ্লেটের নকশা ও বিন্যাসে পরিবর্তন এনে সংশোধিত বিধিমালা জারি করা হয়েছে।

গত শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিআরটিএর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক সতর্কবার্তায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, শিক্ষানবিশ লাইসেন্সধারীরা কেবল বৈধ প্রশিক্ষকের সঙ্গে প্রশিক্ষণের নির্দিষ্ট সময়েই মোটরযান চালাতে পারবেন এবং এ সময় গাড়ির দৃশ্যমান স্থানে লাল রঙের বড় ‘L’ চিহ্ন প্রদর্শন বাধ্যতামূলক।

প্রচলিত মোটরযান অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কোনো শিক্ষানবিশ চালক রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হলে তার গাড়ির সামনে ও পেছনের অংশে দৃশ্যমান স্থানে লাল রঙের বড় ‘L’ চিহ্ন লিখে কিংবা আলাদা বোর্ড ঝুলিয়ে রাখতে হয়, যা মূলত ‘Learner’ শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ।

এই বিশেষ চিহ্ন দেখে রাজপথের অন্য চালকরা সহজেই বুঝতে পারেন যে গাড়িটি একজন নতুন চালক চালাচ্ছেন, যার ফলে তারা অধিক সতর্ক থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে গাড়ি চালাতে পারেন।

এদিকে মোটরসাইকেলের সামনের অংশে নম্বরপ্লেট স্থাপন ও সঠিক রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্রদর্শনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিভিন্ন বিধিগত জটিলতা পুরোপুরি দূর করতে সড়ক পরিবহণ বিধিমালা, ২০২২-এ গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন এনেছে সরকার।

সম্প্রতি সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসচিব আল-আমীন মোপ্রকৃত নূরুল ইসলামের নিজ স্বাক্ষরে এই সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে, যেখানে এই সংশোধিত বিধানগুলো অবিলম্বে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।

সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮-এর ধারা ১২২-এ প্রদত্ত বিশেষ ক্ষমতাবলে জারি করা এই প্রজ্ঞাপনে মূলত সড়ক পরিবহণ বিধিমালা, ২০২২-এর ৩৬ নম্বর বিধির মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট বিধানে এই সংশোধনী আনা হয়েছে।

নতুন এই সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, এখন থেকে মোটরসাইকেলের সামনের রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্রচলিত সাধারণ বিন্যাসের পাশাপাশি এক লাইনেও লেখার সুযোগ রাখা হয়েছে এবং মোটরসাইকেলের নিজস্ব নকশা ও কাঠামোর সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্য রেখে সামনের নম্বরপ্লেটের সঠিক আকার ও বিন্যাস নির্ধারণের সম্পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বিআরটিএকে।

প্রয়োজন সাপেক্ষে কর্তৃপক্ষ নম্বরপ্লেটের ভেতরের অক্ষরের সুনির্দিষ্ট উচ্চতা, সংশ্লিষ্ট জেলা বা অঞ্চলের নাম নির্দেশকারী অক্ষরের আকার এবং নির্দিষ্ট যানবাহনের শ্রেণি নির্দেশকারী অক্ষরের উচ্চতা নির্ধারণ করতে পারবে।

এ ছাড়াও নম্বরপ্লেটের উল্লম্ব অংশে ফাঁকা জায়গার পরিমাণ, দুটি সংখ্যার মধ্যবর্তী ন্যূনতম দূরত্ব এবং দ্বিতীয় লাইনে থাকা সংখ্যাগুলোর মধ্যবর্তী হাইফেনের দৈর্ঘ্য কত হবে, তাও নির্ধারণ করার এখতিয়ার থাকবে কর্তৃপক্ষের হাতে।

একই লাইনে রেজিস্ট্রেশন নম্বর লেখার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলা বা অঞ্চলের নাম এবং নির্দিষ্ট যানবাহনের শ্রেণি নির্দেশকারী অক্ষরের ঠিক পরপরই নির্ধারিত দৈর্ঘ্যের হাইফেন ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট সুযোগ রাখা হয়েছে।

পাশাপাশি নম্বরপ্লেটগুলোতে বিপরীতমুখী রেট্রো-রিফ্লেক্টিভ প্লেট ব্যবহারের বিষয়টিও এই নতুন বিধিমালার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে নম্বরপ্লেটের সামগ্রিক দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি যেকোনো যানবাহন খুব সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে বর্তমান বিধিমালার ৩৬ নম্বর বিধির সংশ্লিষ্ট উপবিধিগুলোতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার পাশাপাশি উপবিধি (১০) থেকে ‘মোটরসাইকেল এবং’ এই দুটি শব্দ বাদ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মূলত বর্তমানে বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও মডেলের মোটরসাইকেলের সামনের অংশের নকশা ও কাঠামো একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ায় অনেক বাইকে প্রচলিত আকারের নম্বরপ্লেট সঠিকভাবে স্থাপন করা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

এই বাস্তব সমস্যা সমাধানের জন্যই মূলত প্রতিটি মোটরসাইকেলের নিজস্ব গঠন ও ডিজাইন অনুযায়ী নম্বরপ্লেটের সঠিক আকার ও বিন্যাস নির্ধারণ করার এই যুগোপযোগী সুযোগ রাখা হয়েছে।

রাজপথে চলাচলকারী প্রতিটি যানবাহন সঠিকভাবে শনাক্তকরণ, কঠোরভাবে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ এবং সার্বিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই সামনের নম্বরপ্লেটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য বড় শহর ও দূরপাল্লার মহাসড়কগুলোতে মোটরসাইকেলের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় যানবাহন পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা (সিসিটিভি) এবং স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তির সর্বাধুনিক ব্যবহারের মাধ্যমে যখন যানবাহন পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে, তখন মোটরসাইকেলের সামনের নম্বরপ্লেট খুব সহজেই নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

আর এই পুরো প্রক্রিয়ার জন্য নম্বরপ্লেটের সুনির্দিষ্ট অক্ষর, সংখ্যা এবং এর নিখুঁত বিন্যাস একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি।

সংশোধিত এই নতুন বিধিমালার ফলে মোটরসাইকেলের সামনের নম্বরপ্লেটের কাঙ্ক্ষিত নকশা ও বিন্যাস নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিআরটিএর প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করার শক্ত ও আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

তবে ঠিক কোন ধরনের মোটরসাইকেলে কোন মাপের বা আকারের নম্বরপ্লেট বসানো বাধ্যতামূলক হবে এবং এর সামগ্রিক বাস্তবায়নের সঠিক পদ্ধতি কী হবে, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে কর্তৃপক্ষের পরবর্তী প্রজ্ঞাপন বা নির্দেশনার ওপর।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান যে, দেশের সড়কে পরিপূর্ণ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই এখন অন্যান্য চার চাকা বা ভারী যানবাহনের পাশাপাশি দুই চাকার মোটরসাইকেলগুলোকেও আধুনিক ক্যামেরার সুক্ষ্ম নজরদারির আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।