ক্যালিফোর্নিয়ায় ৫৪৮ বন্দির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলেন গভর্নর নিউসাম

অনলাইন ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫৪৮ জন বন্দির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর করেছেন গভর্নর গ্যাভিন নিউসাম, যার ফলে এসব বন্দিকে জীবনের বাকি সময় কারাগারেই কাটাতে হবে এবং তাদের প্যারোলে মুক্তির কোনো সুযোগ থাকবে না।

এক চিঠিতে নিউসাম এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে অপরাধীদের কারাগারেই স্বাভাবিক মৃত্যুর সুযোগ দেওয়া যায় এবং এর মাধ্যমেই একই সঙ্গে অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ ও সম্মান জানানো সম্ভব।

নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেই তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের সাজা কমানোর এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান এবং তার মতে রাষ্ট্রের অনুমোদনে কাউকে হত্যা করা ক্যালিফোর্নিয়ার মূল্যবোধের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক যা বিচারব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করার পাশাপাশি মানুষের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে।

তবে ক্যালিফোর্নিয়ায় ২০০৬ সালের পর থেকে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি বিধায় এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রভাব অত্যন্ত সীমিত এবং ১৯৭৮ সালে অঙ্গরাজ্যটিতে আবার মৃত্যুদণ্ডের বিধান চালু হওয়ার পর থেকে মাত্র ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট মতে এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে মৃত্যুদণ্ডসংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রিত মামলা ও আইনি প্রক্রিয়ায় প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হতে পারে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় ঐতিহাসিকভাবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি এবং এর আগে ২০১৯ সালে নিউসাম অঙ্গরাজ্যটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেছিলেন।

এদিকে গভর্নর হিসেবে গ্যাভিন নিউসামের বর্তমান মেয়াদ প্রায় শেষের পথে রয়েছে এবং ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য একজন প্রার্থী হিসেবেও রাজনৈতিক মহলে তার নাম জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়ার বাইরে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বার্নার্ড ই হারকোর্ট গণমাধ্যমকে বলেন যে এ ধরনের বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মার্কিন রাজনীতিতে নতুন কিছু নয় এবং ১৯৮১ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁও ঠিক একই ধরনের অবস্থান নিয়েছিলেন ও শেষ পর্যন্ত জনগণের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিলেন, তাই নিউসামের এই সিদ্ধান্তও শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোটারদের সমর্থন আয়েম করতে পারে।

অন্যদিকে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে এবং সম্প্রতি টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় সৃষ্ট চরম বিশৃঙ্খলার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।

আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের (এসিএলইউ) নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থনি ডি রোমেরো গভর্নরের এই সাহসী সিদ্ধান্তকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে স্বাগত জানিয়েছেন এবং তার মতে এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হলো প্রকৃত ন্যায়বিচারের উজ্জ্বল প্রতিফলন ও ক্যালিফোর্নিয়ার দীর্ঘদিনের বর্ণবাদী ও অমানবিক শাস্তিব্যবস্থার অবসানের পথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তবে এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির প্রধান কৌঁসুলি নাথান হচম্যান বলেছেন যে গভর্নর এককভাবে সাজা কমাতে পারলেও সামগ্রিকভাবে মৃত্যুদণ্ড পুরোপুরি বাতিল করার একমাত্র ক্ষমতা কেবল আইনসভা কিংবা ভোটারদের হাতেই ন্যস্ত রয়েছে, আর ক্যালিফোর্নিয়ার সাধারণ ভোটাররা এর আগেও অতীতে দুবার গণভোটে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার পক্ষেই জোরালো রায় দিয়েছিলেন।

অন্যদিকে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই মৃত্যুদণ্ডের একজন কড়া সমর্থক হিসেবে পরিচিত এবং তিনি তার দ্বিতীয় মেয়াদের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহালের কঠোর আদেশ জারি করেছিলেন, যার ফলে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ২৭টি অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড আইনগতভাবে বৈধ রয়েছে এবং অন্য ২৩টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসিতে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়েছে।